Site icon জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর

কোরআনের যে আয়াত মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান

মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করে তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। কারণ মহান আল্লাহ মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি; বরং তাঁর ইবাদতের মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাব, প্রয়োজন, দুর্বলতা ও শক্তি সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তাই তিনিই জানেন কোন কাজ মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং কোনটি ধ্বংসের কারণ। কোরআনে এমন কিছু মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সকল ক্ষেত্রেই শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। সেগুলো হলো-

১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, এসো, আমি তোমাদেরকে পাঠ করে শোনাই যা তোমাদের রব তোমাদের জন্য হারাম করেছেন—তোমরা তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না।

’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)
এটাই ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, জীবন-মৃত্যুর মালিক এবং ইবাদতের একমাত্র হকদার। তাই তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা সবচেয়ে বড় জুলুম। 

আবু জর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন, আমার উম্মতের যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে…।

’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২৩৭) 

২. মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার : তাওহিদের পরপরই আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার অধিকার উল্লেখ করেছেন। মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

ইসলামে পিতা-মাতার সম্মান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁদের সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)

৩. সন্তানদের জীবন ও অধিকার রক্ষা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা কোরো না।

আমিই তোমাদের এবং তাদের রিজিক দান করি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১) 

জাহেলি যুগে আরবরা দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করত। ইসলাম এই বর্বর প্রথাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
অতএব সন্তান শুধু পারিবারিক সদস্য নয়; তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত।

৪. অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের কাছেও না যাওয়া : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : আনআম, ৬:১৫১)

আল্লাহ শুধু ব্যভিচার নয়, বরং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথ—অশ্লীলতা, কুদৃষ্টি, অনৈতিক সম্পর্ক ও লজ্জাহীনতাও নিষিদ্ধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর চেয়ে অধিক গাইরতসম্পন্ন আর কেউ নেই। এজন্যই তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব অশ্লীল কাজ হারাম করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৯৯)

৫. নিরপরাধ প্রাণ হত্যা থেকে বিরত থাকা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে প্রাণকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা কোরো না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

অন্যায়ভাবে হত্যা ইসলামে সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধগুলোর একটি।

৬. মানুষের সম্মান, অঙ্গীকার ও ন্যায়বিচার রক্ষা : ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি চরিত্র গঠনেরও ধর্ম। একজন মুসলিমের কথা, প্রতিশ্রুতি ও আচরণ বিশ্বস্ত হওয়া আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ কোনো কথা উচ্চারণ করে না, কিন্তু তার নিকট একজন পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকে।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার ঈমান পূর্ণ নয়; আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার দ্বীন পূর্ণ নয়।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১২৫৬৭)

৭. ইসলামের নির্দেশনাগুলো পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটাই আমার সরল পথ; অতএব তোমরা এ পথই অনুসরণ করো এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ কোরো না; তাহলে সেগুলো তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫৩)

সুরা আনআমের এই মহান নির্দেশনাগুলো মানবজীবনের জন্য আল্লাহপ্রদত্ত এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রের মৌলিক নীতিমালা একত্রে তুলে ধরা হয়েছে। যে ব্যক্তি এই বিধানগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে অনুসরণ করবে, তার জীবন হবে ঈমান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ; সমাজ হবে নিরাপদ, পরিবার হবে সুখী এবং রাষ্ট্র হবে ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের এই মহান নির্দেশনাগুলো বুঝে আন্তরিকতার সঙ্গে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সৌজন্যে কালের কণ্ঠ

Exit mobile version