বিশেষ প্রতিনিধি:
আজ পহেলা সেপ্টেম্বর, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বর্বরোচিত ‘রানীগঞ্জ গণহত্যা দিবস’। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনী তাদের স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় প্রাচীন নৌ-বন্দর রানীগঞ্জ বাজারে মেতে উঠেছিল হত্যাযজ্ঞে। একাত্তরের ৩১ আগস্ট শ্রীরামসি গ্রামে প্রথম গণহত্যার ঠিক পরের দিনই এই দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়, যার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রানীগঞ্জের শহিদদের স্মরণে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি ‘স্মৃতি পরিষদ’ গঠন না হওয়ায় ক্ষোভ ও আক্ষেপ বিরাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকাররা ‘শান্তি কমিটি’ গঠনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাজারে মাইকিং করে। সরল বিশ্বাসে রানীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী, আশপাশের গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষ, ক্রেতা-বিক্রেতা এবং নদীতে থাকা বড় বড় নৌকার মাঝিসহ প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে বাজারের একটি বড় দোকানে জড়ো করা হয়।
উপস্থিত মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে সবাইকে রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। এরপর তাদেরকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় কুশিয়ারা নদীর তীরে। সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পেছন থেকে নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করে মেতে ওঠা হয় উৎসবে।
গুলির আঘাতে একের পর এক নিথর দেহ লুটিয়ে পড়ে কুশিয়ারা নদীর বুকে। স্রোতের সাথে ভেসে যায় লাশের পর লাশ, নদীর পানি রূপ নেয় লাল রক্তগঙ্গায়। এই বর্বরোচিত তাণ্ডবে দুই শতাধিক মানুষ শহিদ হন। হত্যাকাণ্ডের পর মাত্র ৩৪ জন শহিদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও, বাকিদের পরিচয় আজও অজানা রয়ে গেছে। শুধু মানুষ হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি হানাদাররা, পুরো রানীগঞ্জ বাজারে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে ছাই করে দিয়েছিল তারা।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারও দিবসটি স্মরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। স্থানীয় ‘শহিদ গাজী ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছরই নিয়মিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে আসছে। এবারও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, একাত্তরের এই বীর শহিদদের স্মৃতি তরুণ প্রজন্মের মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে একটি স্মৃতি পরিষদ গঠন করা হোক।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসলাম উদ্দিন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন করা হবে।