1. forarup@gmail.com : jagannthpur25 :
বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন

ওজনে কম দেওয়ায় যে পরিণতি হয়েছিল মাদয়ানবাসীর

  • Update Time : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ Time View
ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের জীবিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইসলাম ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং হালাল উপার্জনকে উৎসাহিত করেছে।

তবে ব্যবসার সঙ্গে সততা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষার শর্ত জুড়ে দিয়েছে। কারণ একজন মানুষের ইবাদত যেমন আল্লাহর কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানুষের সঙ্গে তার লেনদেনও ঈমানের বাস্তব প্রতিফলন। 

পবিত্র কোরআনে প্রাচীন মাদয়ানবাসীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এ কারণেই যে, তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হলেও লেনদেনে প্রতারণা, মাপে-ওজনে কম দেওয়া, মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়েছিল। তাদের সংশোধনের জন্য আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছিলেন তাঁর নবী শুআইব (আ.)-কে।

কিন্তু তারা সত্যের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অন্যায় কাজে অটল থাকে। পরিণামে তাদের ওপর নেমে আসে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি। 

মাদইয়ানবাসীর প্রতি শুআইব (আ.)-এর আহ্বান

হজরত শুআইব (আ.) তাঁর জাতিকে সর্বপ্রথম তাওহিদের দিকে আহ্বান করেন। তিনি বলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো।

তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। অতএব তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য জিনিস কম দিয়ো না। পৃথিবীতে সংস্কারের পর বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮৫) 

তিনি মানুষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন—আল্লাহর ইবাদত করে মানুষের অধিকার নষ্ট করা যায় না।

নামাজ-রোজার পাশাপাশি মাপ-ওজনে সততা, লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং মানুষের সম্পদের প্রতি আমানতদারি বজায় রাখাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। 

মাদইয়ানবাসীর অন্যতম বড় অপরাধ ছিল মাপ ও ওজনে কারচুপি। তারা নিজেদের জন্য নেওয়ার সময় পূর্ণ মাপ-ওজন গ্রহণ করত; কিন্তু অন্যকে দেওয়ার সময় কম দিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে; কিন্তু যখন তাদের জন্য মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১–৩)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোরআন মাপে কম দেওয়াকে নিছক ছোটখাটো ব্যবসায়িক ভুল হিসেবে দেখেনি; বরং এর বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছে। কারণ একজন ব্যবসায়ী যখন একজন ক্রেতার অধিকার সামান্য হলেও নষ্ট করেন, তখন তিনি শুধু একটি পণ্যের পরিমাণ কম দেন না; বরং মানুষের বিশ্বাস ও সামাজিক আস্থায় আঘাত করেন।

মাদইয়ানবাসী নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অজুহাত তুলে অন্যায়কে বৈধ মনে করত। তারা বলত, ‘হে শুআইব! তোমার নামাজ কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদত করত, আমরা তা পরিত্যাগ করব অথবা আমাদের সম্পদে আমরা যা ইচ্ছা তা-ই করব?’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৭)

এই বক্তব্যের মধ্যে একটি ভয়ংকর মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে—‘আমার সম্পদ, আমি যা ইচ্ছা তাই করব।’ ইসলাম এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। সম্পদ মানুষের হাতে আমানত। মানুষ সম্পদের মালিক হলেও সে পরম স্বাধীন নয়। সম্পদ অর্জনের পদ্ধতি, ব্যয়ের পদ্ধতি এবং অন্যের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়ে তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তাই ইসলামে ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা আয় করেছি?’—এটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো—কীভাবে আয় করেছি? কার অধিকার নষ্ট করে আয় করেছি কি না?

মসজিদে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে ভয় করা যেমন ঈমানের দাবি, তেমনি দোকানে বসে ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা না করাও ঈমানের দাবি। কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা হলো, একজন মুমিনের তাকওয়া তার ব্যবসা, চাকরি, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক লেনদেন—সব জায়গায় প্রকাশ পাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত : ১০১)

অতএব পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, ওজনে কম দেওয়া, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দেওয়া, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে চালিয়ে দেওয়া কিংবা ক্রেতার অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা—এসব কোনোভাবেই ইসলামী ব্যবসায়িক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নিজ জাতির বিরোধিতা সত্ত্বেও শুআইব (আ.) তাদের সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যান। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমি তো আমার সাধ্য অনুযায়ী সংস্কার করতে চাই। আমার সাফল্য তো আল্লাহরই সাহায্যে। আমি তাঁর ওপরই নির্ভর করি এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাই।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৮)

মাদইয়ানবাসী শুআইব (আ.)-এর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার পরিবর্তে তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের হুমকি দিতে শুরু করে। তারা বলেছিল, ‘হে শুআইব! আমরা তোমাকে এবং তোমার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে তাদের আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব, অথবা তোমরা অবশ্যই আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮৮)

এখানেই তাদের অপরাধ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়—ব্যক্তিগত অনৈতিকতা থেকে তা সামাজিক জুলুম ও সত্যবিরোধী অবস্থানে পরিণত হয়। যখন তারা অব্যাহতভাবে সত্য প্রত্যাখ্যান করল এবং নিজেদের অন্যায় থেকে ফিরে এল না, তখন আল্লাহর আজাব তাদের গ্রাস করল। কোরআনে এসেছে, ‘অতঃপর ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল; ফলে তারা নিজেদের ঘরের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯১)

অন্য আয়াতে তাদের পরিণতি বর্ণনা করে বলা হয়েছে, ‘যারা শুআইবকে অস্বীকার করেছিল, তারা যেন সেখানে কখনো বসবাসই করেনি। যারা শুআইবকে অস্বীকার করেছিল, তারাই ছিল ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯২)

আর সুরা হুদে এসেছে, ‘যখন আমার নির্দেশ এসে পৌঁছল, তখন আমি শুআইব ও তাঁর সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদের আমার রহমতে রক্ষা করলাম এবং জালিমদের এক ভয়াবহ বিকট আওয়াজ পাকড়াও করল; ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৯৪)

হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও মাদইয়ানের ঘটনা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সময় বদলেছে, ব্যবসার পদ্ধতি বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু প্রতারণার মূল চরিত্র বদলায়নি। আগে মাপে কম দেওয়া হতো দাঁড়িপাল্লায়; এখন কারচুপি হতে পারে ডিজিটাল ওজনে। আগে পণ্যের ত্রুটি গোপন করা হতো সরাসরি; এখন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের আড়ালে তা লুকানো হতে পারে। আগে বাজারে ক্রেতাকে ঠকানো হতো; এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও ভুয়া ছবি, মিথ্যা তথ্য, নকল রিভিউ ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারিত করা সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও আল্লাহর দৃষ্টি থেকে কোনো কিছুই গোপন নয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আমানতসমূহ তাদের হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেন এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে নির্দেশ দেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

তাই একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর প্রকৃত সাফল্য শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া বা বিপুল সম্পদের অধিকারী হওয়া নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো—হালাল উপায়ে আয় করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং আল্লাহর কাছে পরিচ্ছন্ন হিসাব নিয়ে হাজির হওয়া।সৌজেন্য কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর
জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬
Design & Developed By ThemesBazar.Com