1. forarup@gmail.com : jagannthpur25 :
শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন

অহংকারী ইবাদত এক আত্মপ্রবঞ্চনা

  • Update Time : মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১২ Time View

মানুষের দুনিয়াবি চোখে পাপী মানে ব্যর্থ, আর ইবাদতকারী মানে সফল; কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে বিষয়টি এত সরল নয়। ইবাদতের বাহ্যিক রূপ যত আকর্ষণীয় হোক, যদি অন্তরে অহংকারের দাগ পড়ে, তবে সেই ইবাদতই হয়ে যেতে পারে ধ্বংসের কারণ। অপরদিকে, যে মানুষ নিজের গোনাহে কাঁদে, লজ্জিত হয়, আল্লাহর দরবারে বিনীত হয়ে ফিরে আসে—তার সেই বিনয়ই হতে পারে মুক্তির চাবিকাঠি।

অহংকারী ইবাদত এক আত্মপ্রবঞ্চনার নাম

ইবাদত মানে আল্লাহর সামনে বিনম্র হওয়া।
কিন্তু যখন ইবাদতই অহংকারের উৎসে পরিণত হয়, তখন তা আর ইবাদত থাকে না, বরং আত্মপ্রবঞ্চনা হয়ে দাঁড়ায়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘সুতরাং তুমি তোমার আত্মাকে পবিত্র বলে মনে করো না; কে বেশি তাকওয়াবান তা আল্লাহই ভালো জানেন।’ (সূরা আন-নাজম, আয়াত : ৩২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন—‘যে ব্যক্তি তার অন্তরে এক কণামাত্র অহংকার রাখে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)

ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মপ্রশংসা নয়।
কিন্তু যখন কেউ নিজের আমল দেখে নিজেকে বিশেষ মনে করে, অন্যদের তুচ্ছ ভাবে, তখন তার অন্তর থেকে বিনয় চলে যায়। আর বিনয়হীন ইবাদত আল্লাহর দরবারে মূল্যহীন।

ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন— ‘অহংকারী ইবাদতকারী নিজেকে এমন ভাবে উপস্থাপন করে, যেন সে আল্লাহকে ঋণ দিচ্ছে; অথচ সে ভুলে যায়, আল্লাহ তার অস্তিত্বকেও অনুগ্রহ হিসেবে দিয়েছেন। (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন)

ভীত গোনাহগারের অনুতাপ

অন্যদিকে, গোনাহগার যে ব্যক্তি নিজের পাপের জন্য সর্বদা ব্যথিত, সে আল্লাহর দরবারে অনেক কাছাকাছি।

কারণ আল্লাহ্ ভালোবাসেন অনুতপ্ত হৃদয়কে। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোবাসেন তওবাকারী এবং যারা নিজেদের পবিত্র রাখে।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ২২২)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে গোনাহ করে, তারপর আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়, সে এমন যেন কোনো গোনাহই করেনি।’ (ইবন মাজাহ, হাদিস: ৪২৫০)

অতএব, গোনাহগার কিন্তু অনুতপ্ত হৃদয়বান ব্যক্তি আসলে আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে। তার অনুতাপই তার মুক্তির পথ।

হৃদয়ের অবস্থারই প্রকৃত মূল্য

ইবাদত বা পাপ; দুটিই আল্লাহর সামনে “গণনা” নয়, বরং “অবস্থা”। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন— ‘আল্লাহ তোমাদের রূপ ও সম্পদ দেখেন না; তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৬৪)
অতএব বাহ্যিক ধার্মিকতার মুখোশ যদি হৃদয়ের ভিতর অহংকার জন্মায়, তবে তা একপ্রকার আত্মধ্বংস। আবার পাপের পোশাকের আড়ালে যদি বিনয় ও অনুতাপ থাকে, তবে সেই অন্তরই আল্লাহর প্রিয়।
হাসান বসরী (রহ.) বলেন— “তুমি যদি কাউকে গোনাহে দেখতে পাও, তাকে অবজ্ঞা করো না। হতে পারে, সে তার পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর প্রিয় হয়ে যাবে, আর তুমি তোমার অহংকারের কারণে ধ্বংস হবে।”

কেন ভীত গোনাহগার উত্তম?

• কারণ সে নিজেকে ছোট মনে করে, আর আল্লাহ বড়কে ভালোবাসেন না।
• কারণ তার চোখে গোনাহ বড়, আর আমল ছোট; এটাই তাওবার নিদর্শন।
• কারণ সে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসে, আর অহংকারী ইবাদতকারী রহমত থেকে দূরে যায়।
• কারণ সে পাপের পরেও আল্লাহর দরজায় মাথা নত করে, আর অহংকারী ইবাদতকারী নিজের আমলের ওপর ভরসা করে।

আজ আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা নামাজ, রোজা, ইসলামি পোশাক—সবকিছু করে; কিন্তু অন্যকে ছোট করে দেখে, গোনাহগারদের প্রতি ঘৃণা ছুঁড়ে দেয়। আবার কিছু মানুষ নিজেদের দুর্বলতা জেনেও আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, কান্না করে, চেষ্টা চালিয়ে যায়। আল্লাহর নিকট এই দ্বিতীয় শ্রেণিই বেশি প্রিয়।

আমরা ভুলে যাই—আমল জান্নাতে প্রবেশের কারণ নয়, বরং আল্লাহর রহমতই প্রকৃত কারণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির আমল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না।”

সাহাবারা বললেন, “আপনাকেও নয়, হে আল্লাহর রাসুল?” তিনি বললেন, “আমাকেও নয়, যদি না আল্লাহ আমাকে তাঁর অনুগ্রহে ঢেকে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৬)

মনে রাখতে হবে অহংকার আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে ঘৃণিত, আর বিনয় সবচেয়ে প্রিয়। অহংকারী ইবাদতকারী নিজের ইবাদতের মাধ্যমে জান্নাতের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়; আর ভীত গোনাহগার নিজের কান্না ও অনুতাপ দিয়ে জান্নাতের দরজায় পৌঁছে যায়।
তাই নিজের আমলে গর্ব নয়, বরং ভয়, লজ্জা ও আশা—এই তিন অনুভূতি নিয়ে চলাই প্রকৃত ঈমানদারের পথ।
কারণ, “আল্লাহর কাছে ভগ্ন হৃদয়ই সবচেয়ে উঁচু।”

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর
জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬
Design & Developed By ThemesBazar.Com