1. forarup@gmail.com : jagannthpur25 :
শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০০ অপরাহ্ন

কঠিন সময় কেন আসে? কোরআনে আলোকে বিপদের ৭ কারণ

  • Update Time : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ Time View

জীবনের পথচলায় দুঃখ-কষ্ট, নিপীড়ন আর কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া মানবজীবনের এক নিত্যসঙ্গী। কোরআনে আল্লাহ–তাআলা সুসংবাদ দিয়েছেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।” (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬)

তবুও মানবমনে স্বাভাবিকভাবেই এক গভীর প্রশ্ন জাগে: জীবন কেন শুধুই সুখের হতে পারে না? কেন মুমিনকে জুলুম, অত্যাচার ও নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়? কেন মহান আল্লাহ কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সত্যকে তাৎক্ষণিক বিজয় দান করেন না?

মক্কার কোরাইশরা দীর্ঘকাল প্রিয় নবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিদের অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিল। অথচ আল্লাহ চাইলে এক নিমেষে তাদের সবার হৃদয়কে সত্যের দিকে ফিরিয়ে দিতে পারতেন কিংবা রক্তপাত ও কষ্ট ছাড়াই ইসলামকে বিজয়ী করতে পারতেন।

কেন তবে নিরপরাধ মানুষকেও এই কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়? পবিত্র কোরআনের আলোকে বিপদের পেছনের ৭ কারণ পর্যালোচনা।

১. সত্যের পরীক্ষা ও খাঁটি মুমিন নিরূপণ

মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, “যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে তিনি নিজেই তাদের পরাজিত করতেন; কিন্তু তিনি তোমাদের একে অপরের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে চান।” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৪)।

আল্লাহ তাআলা অবশ্যই যেকোনো শক্তিকে এক নিমেষে ধ্বংস করতে সক্ষম। কিন্তু তাঁর চিরন্তন নিয়ম হলো বান্দাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করা। কারণ, “তিনিই মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য যে কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম।” (সুরা মুলক, আয়াত: ২)

শান্তিকালীন সময়ে সবাই সত্যের সমর্থক হওয়ার দাবি করতে পারে। কিন্তু কষ্টের সময়েই বোঝা যায় কার দাবি সত্য আর কার দাবি মিথ্যা। কোরআনে বলা হয়েছে, “মানুষ কি মনে করে যে ‘আমরা ইমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২)

এই কঠিন পরীক্ষাগুলোই সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীদের আলাদা করে দেয়। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৩)

২. আল্লাহর সঙ্গে অন্তরের নিবিড় সংযোগ

সুরা বাকারায় বর্ণিত হয়েছে যে অতীতে রাসুলগণ ও তাঁদের সঙ্গী মুমিনগণ যখন চরম দুঃখ-কষ্ট ও উৎপীড়নে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন তারা ব্যাকুল হয়ে বলে উঠেছিলেন, “আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?” তখন আল্লাহ–তাআলা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অত্যন্ত নিকটে!” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৪)।

বিপদ-আপদ মানুষকে জাগতিক সব অবলম্বন ভুলিয়ে দিয়ে সরাসরি একমাত্র আল্লাহর দিকে ধাবিত করে। সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে মানুষ যেভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, বিপদের সময়ে তাওয়াক্কুল ও তওহীদের সেই বিশুদ্ধ অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। কঠিন মুহূর্তগুলো মুমিনের অন্তরকে শতভাগ আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

৩. আত্মিক পরিশুদ্ধি

ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের আংশিক বিপর্যয়ের পর কোরআনে বলা হয়েছে, “…এবং যেন আল্লাহ মুমিনদের পরিশুদ্ধ করতে পারেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪১)

ইসলামে বিপদকে ‘ফিতনা’ বলা হয়, যার লৌকিক অর্থ হলো আগুনে পুড়িয়ে সোনা খাঁটি করা। আগুন যেমন সোনার মূল গুণাগুণ নষ্ট করে না, বরং এর ভেতরের খাঁদ বা ময়লা পুড়িয়ে তাকে আরও সুন্দর ও নিখাদ করে তোলে—ঠিক তেমনি কঠিন পরিস্থিতি মুমিনের ভেতরের দুনিয়ামুখী ভালোবাসা, অলসতা ও অতীত পাপের ময়লা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়।

বিপদের সময় মানুষ নিজের ভুলত্রুটি অনুধাবন করার সুযোগ পায়। কোরআনে বলা হয়েছে, “বলো, এটি তোমাদের নিজেদের থেকেই এসেছে।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৫)

এই আত্মপর্যালোচনা মানুষকে সংশোধনের সুযোগ করে দেয়।

৪. সুবিধাবাদীদের মুখোশ উন্মোচন

একক ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি সমাজ বা উম্মাহর সার্বিক মঙ্গলের জন্যও সংকটকাল অপরিহার্য।

কোরআনে বলা হয়েছে, “দুই দল যেদিন মুখোমুখি হয়েছিল, সেদিন তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় এসেছিল, তা আল্লাহর হুকুমেই হয়েছিল; এবং যেন তিনি মুমিনদের চিনে নিতে পারেন, আর যেন প্রকাশ করে দিতে পারেন মোনাফেকদের।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৬-১৬৭)

যেকোনো সমাজে বা আন্দোলনে এমন একদল লোক থাকে যারা শুধু সুবিধা ভোগ করার জন্য সত্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু যখনই সংকটকাল উপস্থিত হয়, তখনই তারা নিজেদের আসল রূপ প্রকাশ করে এবং পেছন থেকে আঘাত হানে।

সংকটকাল সমাজকে এসব সুবিধাবাদী ও মোনাফিকদের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষার পথ দেখায়।

৫. তওবা ও বিনীত ইবাদতের সুযোগ

ইসলামে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা। (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

কিন্তু ইবাদত শুধু বাহ্যিক কিছু শারীরিক অনুশীলনে সীমাবদ্ধ নয়। ধৈর্য (সবর), পূর্ণ নির্ভরতা (তাওয়াক্কুল), বিনয় ও তওবার মতো আত্মিক ইবাদতগুলো শুধু কঠিন সময়ের প্রেক্ষাপটেই শতভাগ বিকশিত হয়।

ইউনুস (আ.) যখন মাছের পেটের অন্ধকারের চরম সংকটে পড়েছিলেন, তখনই তাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল তওবার কালজয়ী বাক্য, “আপনি ছাড়া কোনো ইবাদতের উপযুক্ত নেই, আপনি পরম পবিত্র; নিশ্চয়ই আমি সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)

বিপদ মানুষকে আল্লাহর সামনে বিনীত হতে শেখায়।

৬. শাহাদাতের সুউচ্চ মর্যাদা দান

সত্যের ওপর স্থির থাকতে গিয়ে জীবনের পরম আত্মত্যাগ বা কোরবানিকে আল্লাহ–তাআলা অত্যন্ত সম্মানিত করেছেন। বলা হয়েছে, “…এবং যেন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে শহীদদের বেছে নিতে পারেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪০)।

কঠিন পরিস্থিতির মাধ্যমেই আল্লাহ কিছু মনোনীত বান্দাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তথা জীবন বিসর্জন দেওয়ার সুযোগ করে দেন এবং পরকালে বেহেশতের এমন সুউচ্চ মর্যাদা দান করেন, যা সাধারণ অবস্থায় অর্জন করা সম্ভব হতো না।

৭. কষ্টের পর স্বস্তির সুনিশ্চিত ওয়াদা

পরিশেষে, মহান আল্লাহ আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।” (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬)

যে ব্যক্তি বিপদের পেছনের এই ঐশ্বরিক প্রজ্ঞাগুলো দেখতে পায় না, সে কষ্টের পর আসা মহামূল্যবান স্বস্তি ও বিজয়ের সৌন্দর্যও উপলব্ধি করতে পারে না।

কঠিন সময় মানবজীবনের কোনো ব্যর্থতা নয়; বরং এটি হলো খাঁটি মুমিন হওয়ার যাত্রাপথ। সংকটকালে ভেঙে না পড়ে, হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে আমাদের উচিত ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিপালকের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখা, নিজেদের ভুল শুধরে নেওয়া এবং একমাত্র আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা। সৌজন্যে প্রথম আলো

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর
জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬
Design & Developed By ThemesBazar.Com