উপুর্যপুরি বন্যার করাল গ্রাসে দেশের বিভিন্ন এলাকা বিপর্যয়ের মুখে। বন্যা যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তেমনি এর পেছনে দায় রয়েছে আমাদের পরিবেশ, প্রতিবেশের পরিচর্যা না করে অপরিণামদর্শী উন্নয়ন প্রকল্প এই দুর্যোগের অন্যতম কারণ। বর্তমান যুগে অবকাঠামো উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দৃশ্যমান উন্নয়নে মনোযোগ বেশি দিতে হয়। অথচ অবকাঠামো উন্নয়নে পানির প্রবাহ নষ্ট হচ্ছে কিনা, পরিবেশ-প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কিনা তা নিয়ে হয়না তেমন কোনো পর্যালোচনা। তাছাড়া একাধিক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে থাকেনা কোনো সমন্বয়। একটি এলাকার উন্নয়ন কৌশল ঐ এলাকার বাস্তবতা অনুযায়ী হওয়া উচিত। প্রকল্প গ্রহণ, প্রাক্কলন সবই হওয়া উচিত স্থানীয় ভিত্তিতে। এলাকার চাহিদা অনুযায়ী। অথচ কেন্দ্রীয়ভাবে নিদিষ্ট ডিজাইনে, নির্দিষ্ট রেটে, নির্ধারিত সময়ে সকল এলাকায় যথাযথভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এজন্য বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বছরের পর বছর মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয় উন্নয়ন কৌশলের অালোকে যদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ না করা হয়। তাহলে জোড়াতালির উন্নয়ন মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপকারের পরিবর্তে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যেমনটা হয়েছে অামাদের চারপাশে। অপরিকল্পিত বেড়ীবাঁধ, স্লুইসগেট ইত্যাদি প্রথাগত ধারণা বন্যা নিয়ন্ত্রণ না করে বন্যা আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে। নালা, ছড়া, খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ যত্রতত্র বিভিন্ন স্থাপনা অবৈজ্ঞানিকভাবে অহেতুক কালভার্ট তৈরী সমস্যাগুলোকে আরো ভয়াবহ করছে।
বিভিন্ন সময় গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে অনেকাংশেই এর সমাধান সম্ভব হত। সিলেট অঞ্চলে বন্যা ব্যবস্থাপনার একটি প্রকল্প ছিল কালনী-কুশিয়ারা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। কেবল আন্তরিকতা ও সঠিক পদক্ষেপের অভাবে এই প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিস্তীর্ন এলাকার মানুষ।
সিলেট বিভাগের কালনী-কুশিয়ারা নদী ব্যবস্থা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বড় নদী ব্যবস্থা। জকিগঞ্জের অমলসিদ থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত সুরমার দূরত্ব প্রায় ২০৪ কিলোমিটার। সুনামগঞ্জ থেকে পৈন্দা পর্যন্ত মূলধারাটিই সুরমা নামে পরিচিত। পৈন্দা থেকে দিরাই উপজেলার চানপুর হয়ে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার মারকুলি এলাকায় কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে সুরমার এই প্রধান ধারা। এটি এখন মৃতপ্রায়-পুরান সুরমা নামে অভিহিত। এই ধারায় মিলিত হওয়ার আগে সুরমা নদীর এই শাখাটি দিরাই উপজেলার চানপুর হয়ে সুজানগর থেকে আজমিরীগঞ্জে গিয়ে আবার কালনী নদীতে মিশেছে। এই ধারাটি ‘মরা সুরমা’ নামে পরিচিত। সুরমার দ্বিতীয় শাখাটি পৈন্দা থেকে পশ্চিম দিকে নৌয়া নদী নামে আট কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে উত্তর-পশ্চিমে আরেকটু মোড় নিয়ে আরো ৯ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে। সেখানে জামালগঞ্জের লালপুরের কাছে বৌলাই নদীতে বাঁক নিয়েছে সুরমা। পরবর্তী সময়ে ঘোড়াউত্রা নাম নিয়ে দিলালপুরে গিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। এই নদীপথের সুবিশাল জলরাশি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে জলপ্রবাহ হারিয়েছে।
পুরান সুরমা ও মরা সুরমা এখন বলতে গেলে মৃতপ্রায়। কুশিয়ারা নদী নাব্যতা হারিয়েছে। যে নদী পথে একসময় জাহাজ, বড় বড় স্টিমার চলতো সেই নদীপথগুলেতে এখন বড় নৌকা চলাচলই বাধাগ্রস্ত হয়। নদী মাতৃক বাংলাদেশে শুধুমাত্র রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নদীর গতিপথ নষ্ট হচ্ছে, নাব্যতা হারাচ্ছে নদীগুলো। উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে চর পড়ছে নদীগুলোতে। ইটাখলা,ডাউকিসহ শাখা নদীগুলো অস্তিত্ব হারিয়েছে। হাওরগুলো ভরাট হয়ে গেছে। স্থানে স্থানে জেগেছে চর। নদীর পাড় ভরাট হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে তীরও দখল করে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। পলি পড়ার কারণে নদীগুলি প্রবাহ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে প্রাক মৌসমী বন্যার প্রবণতা বৃদ্ধি, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং কৃষি ও জনবসতি ভাঙ্গনের সম্মুখীন হচ্ছে।
এই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল কালনী-কুশিয়ারা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা। নদীর দীর্ঘমেয়াদী সুস্থিত অবস্থার উন্নতিসাধন এবং উন্নয়নের জন্য সুস্থিত পরিবেশ তৈরীকরণ। প্রাক মৌসুমী বন্যা নিয়ন্ত্রন এবং বর্ষা উত্তর নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষির ক্ষতি কমানো। শুষ্ক মৌসুমে কালনী-কুশিয়ারা নদীতে নৌ-চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন। আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নসহ এলাকার নিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনৈতিক বিরুপ প্রভাব রোধকরন। নদী ভাঙ্গনের ফলে উদ্ভূত পরিবেশ, সামজিক ও অর্থনৈতিক বিরুপ প্রভাব রোধকরন। দারিদ্র বিমোজন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকরন। প্রকল্প এলাকায় ছিল কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলি উপজেলা সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, শাল্লা ও জগন্নাথপুর উপজেলা সিলেট জেলার সিলেট সদর, ফেঞ্জুগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলা । মৌলভীবাজার জেলার মৌলভীবাজার সদর ও হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ, আজমেরীগঞ্জ, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ সদর ও লাখাই উপজেলা।
কালনী-কুশিয়ারা নদী ব্যবস্থপনা প্রকল্প এলাকা সিলেটের দক্ষিণে এবং ভৈরব বাজারের পূর্বে অবস্থিত। দক্ষিনে কুশিয়ারা-বিজনা-রটনা-সুতাং নদী, উত্তরে পুরাতন সুরমা-ডাহুক নদী এবঙ জগন্নাথপুর সিলেট সড়ক, পশ্চিমে পুরাতন সুরমা বৌলাই এবং পূর্বে সিলেট-কাকটাই গ্রামীণ সড়ক দ্বারা পরিবেষ্ঠিত। প্রকল্পটি সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার গ্রস ৩,৩৫,৬০০ হেক্টর এলাকাব্যাপী বিস্তৃত।
প্রায় দশ বছর আগে গৃহিত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে সিলেট বিভাগে বর্তমানে বন্যা যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তেমনটি হতো না। এছাড়াও সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর স্বার্থে ১১টি উপেজলায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৩টি নদীতে ৯২৫ কিলোমিটার অংশ খননের একটি প্রকল্প নিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। একটি কারিগরি টিমের সঙ্গে আমি নিজেও সরেজমিন আমাদের জগন্নাথপুর উপজেলার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছিলাম। প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী ডিজাইন তৈরির জন্য সার্ভেও হয়েছিল । সার্ভের কাজ শেষে ডিজাইন অনুমোদন হলে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুমোদিত হয়।
Leave a Reply