1. forarup@gmail.com : jagannthpur25 :
শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩৩ অপরাহ্ন

‘যে বিষয়ে আপনার জ্ঞান নেই, তাতে ধৈর্য রাখবেন কীভাবে?‘

  • Update Time : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৪ Time View

পবিত্র কোরআনে নবী মুসা ও খিজিরের (আ.) ঐতিহাসিক সাক্ষাতের গল্পটি মানব ইতিহাসের এক পরম শিক্ষণীয় অধ্যায়। যখন নবী মুসাকে সতর্ক করে খিজির বলেছিলেন, “যে বিষয়ে আপনার কোনো পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আপনি কীভাবে ধৈর্য ধারণ করবেন?” (সুরা কাহফ, আয়াত: ৬৮)

এর জবাবে মুসা (আ.) বলেছিলেন, “আল্লাহ চান তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশের অবাধ্য হব না।” (সুরা কাহফ, আয়াত: ৬৯)

এই ঘটনাটি আমাদের স্পষ্ট করে দেখায় যে জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং অজানা বিষয়কে আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর সোপর্দ করাই প্রজ্ঞার মূল ভিত্তি।

অনেকেই বুঝতে চান না, কোনটা কখন অগ্রাধিকার পাবে।  ইসলামি বিধানে কিছু বিষয় ধ্রুব ও অপরিবর্তনীয়, আর কিছু বিষয় পরিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে নমনীয়। একে ‘ফিকহুল আওলাবিয়্যাত’ বলে।

জ্ঞানের সীমানায় বিনয়

কোরআনের এই দূরদর্শী গল্পের মাধ্যমে আল্লাহ–তাআলা নবী মুসা-কে এটিই বুঝিয়েছিলেন যে, তাঁর জ্ঞানের বাইরেও একটি বিশ্ব রয়ে গেছে।

একবার বনি ইসরাইলের এক জনসভায় নবীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কি কেউ আছে?” তাঁর উত্তরে আল্লাহ–তাআলা তাঁকে ওহি মারফত জানিয়ে দেন যে ‘খিজির’ নামের এক বান্দা তাঁর চেয়েও বিশেষ কিছু বিষয়ে অধিক জ্ঞানী। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২২)

মুসা (আ.) ছিলেন কালিমুল্লাহ, যিনি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলতেন; তবুও আল্লাহ তাঁকে দেখিয়ে দিলেন যে একজন মানুষের পক্ষে জগতের সমস্ত জ্ঞান একচ্ছত্রভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়।

ইমাম মালিক (রহ.) প্রায়ই বলতেন, “আমার এমন কিছু শিক্ষক রয়েছেন যাঁদের কাছে আমি দোয়ার জন্য যাই, কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে হাদিসের বর্ণনা গ্রহণ করি না।” (কাজি ইয়াজ, তারতিবুল মাদারিক ওয়া তাকরিবুল মাসালিক, ১/১৫ রাবাত: মাতবাআতুল ফাদালা, ১৯৬৫)

অর্থাৎ মানুষের সামগ্রিক বুজুর্গি আর নির্দিষ্ট বিষয়ের দক্ষতা এক নয়; তাই নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছেই ফিরে যাওয়া উচিত।

ব্যক্তির চেয়ে আদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব

খিজিরের সঙ্গী হওয়ার সময় মুসা (আ.) ধৈর্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে খিজির (আ.) যখন আপাত দৃষ্টিতে ‘অন্যায়’ কিছু কাজ করছিলেন, তখন তিনি নীরব থাকতে পারেননি। কারণ শরিয়তের স্পষ্ট মানদণ্ড তাঁর কাছে ব্যক্তির চেয়ে বড় ছিল। বাহ্যিক অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করাই একজন সচেতন মানুষের নৈতিক নীতি।

কোনো মানুষের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা বুজুর্গির অজুহাতে তার স্পষ্ট অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা সমাজের দেখা দেয়। অথচ নবী মুসার অবস্থান আমাদের শেখায় যে সত্য ও আদর্শের মানদণ্ড যেকোনো ব্যক্তিত্বের চেয়ে ঊর্ধ্বে।

অপূর্ণ জ্ঞান ও তাড়াহুড়ার পরিণতি

খিজিরের সেই ঐতিহাসিক উক্তি, “যে বিষয়ে আপনার জ্ঞান নেই, তাতে ধৈর্য রাখবেন কীভাবে?”—তা বলে, মানুষ যখন কোনো ঘটনার পেছনের কারণ বা চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে পায় না, তখন সে ব্যাকুল ও অধৈর্য হয়ে পড়ে।

এর শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো হোদাইবিয়ার সন্ধি। বাহ্যিকভাবে চুক্তির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হওয়ায় সাহাবিদের একাংশ ভীষণ ব্যথিত ও অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)

কিন্তু আল্লাহ–তাআলা এই দূরদর্শী সন্ধিকেই ‘স্পষ্ট বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেন। (সুরা ফাতহ, আয়াত: ১)

কারণ সাহাবিরা তখন সেই চুক্তির সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক ফলাফল দেখতে পাচ্ছিলেন না।

জ্ঞানের অগ্রাধিকার বিবেচনা

আজকের যুগেও তরুণদের মাঝে যখন আবেগের উত্তাপ থাকে, তখন আবেগপ্রবণ নেতৃত্ব তাদের ক্ষণিকের মধ্যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু বাস্তবে যখন সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, তখন পর্যাপ্ত দূরদর্শিতার অভাবে তারা হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং অনেকে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

অনেকেই বুঝতে চান না, কোনটা কখন অগ্রাধিকার পাবে। ইসলামি বিধানে কিছু বিষয় ধ্রুব ও অপরিবর্তনীয়, আর কিছু বিষয় পরিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে নমনীয়। একে ‘ফিকহুল আওলাবিয়্যাত’ বলে। দুর্ভিক্ষের সময় মানুষকে খাদ্য দেওয়া নফল হজের চেয়ে বেশি জরুরি, কিংবা দেশ ও সমাজ রক্ষা করা সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজের চেয়ে অগ্রাধিকার পায়। (আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/৩৯৪, বৈরুত: দারুল মারেফাহ, ১৯৮২)

সামাজিক পরিবর্তন এক দিনে বা অলৌকিকভাবে ঘটে না; তা ধীরে ধীরে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধিত হয়।

আল্লাহ–তাআলা স্বয়ং নবীজিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, “আমি তাদের যে প্রতিশ্রুতির কথা বলি, তার কিছুটা যদি আপনাকে দেখিয়ে দিই কিংবা আপনার মৃত্যু ঘটাই—আপনার দায়িত্ব তো শুধু বার্তা পৌঁছে দেওয়া, আর হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব আমার। (সুরা রা’দ, আয়াত: ৪০)

শেষ কথা

গাছ রোপণ করেই ফল খাওয়ার জন্য যে তাড়াহুড়ো, তা প্রজ্ঞার পরিচয় নয়। সমাজ সংস্কার বা জীবনের জটিল সংকট মোকাবেলা করার মূল শর্ত হলো—বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করা এবং আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নিয়মের ওপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধরা।

অসম্পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে তাড়াহুড়ো করার চেয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ধীরপদে এগিয়ে যাওয়াই পরম বুদ্ধিমত্তা।

সৌজন্যে প্রথম আলো.কম

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর
জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬
Design & Developed By ThemesBazar.Com