1. forarup@gmail.com : jagannthpur25 :
রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৩৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম:

একজন শহীদুল আলম

  • Update Time : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ Time View

মনোরঞ্জন তালুকদার:
গত ২৭ আগস্ট সরকারি সহকারী অধ্যাপক হিসাবে জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে এক আনন্দঘন পরিবেশে যোগদানের পর প্রাক্তন সহকর্মীদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিলো। প্রসঙ্গক্রমে এই কলেজের স্বল্পকালীন প্রাক্তন অধ্যক্ষ যিনি বর্তমানে সিলেট শিক্ষাবোর্ডর চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন সেই শহীদুল আলম স্যারের প্রসঙ্গ চলে এলো। আলোচনায় সবাই একবাক্যে একজন ভালো মানুষকে মিস করার কথা উল্লেখ করলেন। সবার আলোচনা শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ছিলো রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার কয়েকটি চরণ-

সাতকোটি সন্তানেরে
হে মুগ্ধা জননী,
রেখেছো বাঙালি করে
মানুষ করোনি।
তাহলে কি কবিগুরু ভুল বলেছেন? না কবিগুরু ভুল বলেননি। এখনো আমরা তাই আছি। তবে ব্যতিক্রমও নিশ্চয় আছে। সেই ব্যতিক্রমীদেরই একজন জনাব শহীদুল ইসলাম।
জীবনের এই দীর্ঘ চলার পথে নানা বাঁকে নানা জনের, নানা পেশার অনেক সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে কারো কারো সাথে অল্প-বিস্তর ঘনিষ্টতাও হয়েছে। কিন্ত তাদের মধ্যে কতজনকে মানুষ হিসাবে পেয়েছি? কঠিন আত্ম-জিজ্ঞাসা। খুব কম সংখ্যক মানুষই তার পেশার বা অন্য যেকোন কোন রকমের অহমিকার উর্ধ্বে উঠে মানবিক মানুষ হয়ে উঠতে দেখেছি। যে পেশার বা ব্যক্তির ক্ষমতা যত বেশী তার অহংবোধ ততই প্রবল দেখেছি। বিনয়ী, আলোকিত মানুষ খুব কমই দেখেছি। সেখানেই ব্যতিক্রম জনাব শহীদুল আলম স্যার। উনি যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন মানুষ হয়েও অবসরে যাওয়া এই কলেজের বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সব সময় স্যার বলেই সন্মোধন করেছেন। এই অস্থির সময়ে দুঃস্প্রাপ্য এই বিনয় গুণটি তার মধ্যে সবসময় লক্ষ্য করেছি। তিনি যুগপৎ প্রচন্ডভাবে ধার্মিক ও অসাম্প্রদায়িক একজন মানুষ। প্রসঙ্গক্রমে আব্দুর রউফ প্রভাষক জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ যে আমার ছাত্র এবং শহীদুল ইসলাম স্যারের জগন্নাথপুর কলেজে  সহকর্মী সে তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকটা আবেগ আপ্লূত হয়ে পড়ে। তার অসুস্থ সন্তানকে দেখতে গিয়ে কতটা সময় তার সন্তানের পাশে ছিলেন, সিলেটে অধ্যয়নরত তার বড় সন্তানের জন্য নানা রকম ফল-ফলাদি নিয়ে দেখতে যাওয়ার বর্ণনা দিতে দিতে তার আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়া দেখে বুঝা যায় কি গভীর শ্রদ্ধা তার হৃদয়ে সে ধারণ করে স্যারের জন্য। খুবই সাধারণ এমন দুটি কাজকে এত মহিমান্বিত করার কি আছে- এই প্রশ্ন অনেকের মনে দেখা দিতেই পারে। এই সাধারণ মানবিক মমত্ববোধের জায়গাটুকু আমাদের হৃদয় থেকে ক্রমশঃ ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। তাই এগুলো এত মহান হয়ে উঠছে আমাদের কাছে। যে কাজ শহীদুল আলম করেছেন সেই কাজ আমরা কতজন করি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে? এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত করার প্রশ্নের উত্তর। তাছাড়া আরো একটি ছোট ঘটনা উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলেই মনে করি। আমি যে দিন আত্মীকৃত শিক্ষক হিসাবে কলেজে যোগদান করি সেদিন সন্ধ্যায়ই তিনি আমাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান এবং অবশিষ্ট কাজগুলো যেন সহি সালামতে দ্রুত শেষ হয় তার জন্য দোয়া করেন। তার এ কাজটি কতবড় মহত্বের পরিচায়ক সেটার একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে এখন তিনি সিলেট শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান। ব্যস্ততায় ও উচ্চতায় তার এই কাজ করার কথা নয়।
দ্বিতীয়ত আমি তার সহকর্মী, সহপাঠী কিংবা পূর্বপরিচিত কেউ না। তিনি এই কলেজে যোগদান করার বেশ পূর্বেই আমি অবসরে চলে যাই।
তৃতীয়ত আমার প্রয়োজনে আমি তিন-চার বার কলেজে দেখা করি। তাই তেমন ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিলনা। এমনকি আমার ধারনা অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে আমার সাথেই উনার দূরত্বটা হয়তো বেশী ছিল। সর্বোপরি উনি বর্তমানে জগন্নাথপুর কলেজের অধ্যক্ষও নন। এই প্রেক্ষিতে বিচার করলে তার এই টেলিফোনটি কী সৌজন্যবোধের চরম পরিচায়ক নয়?
প্রফেসর শহীদুল আলম জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের নতুন অধ্যক্ষ হিসাবে ১৯শে এপ্রিল ২০২৫ তারিখে যোগদান করেন এবং ৪আগস্ট ২০২৬ তিনি সিলেট বোর্ডে যোগদান করেন। এই স্বল্পকালীন সময়ে তিনি তার উপস্থিতির স্বাক্ষর নানা ভাবে কলেজ ক্যাম্পাসে রেখে গেছেন। যাহোক  তিনি যেদিন কলেজে যোগদান করেন কাকতালীয় ভাবে সেদিন আমিও কলেজে যাই। সেখানেই তার সাথে আমার দেখা এবং প্রথম পরিচয়। তার সাথে সেদিন কলেজে আমার প্রাক্তন ছাত্র ও শহীদুল আলম স্যারের বিয়ানী বাজার সরকারি কলেজের সহকর্মী অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীমকে তার সঙ্গে দেখতে পাই। শামীম কলেজে এসেছিল স্যারদের মিষ্টি খাওয়ানোর জন্য। এক ঘরোয়া অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেদিন শহীদুল আলম স্যারকে বরণ করা হয়।  শামীমের মত ছাত্রদের সাথে যখন দেখা হয় তখন গর্বে, আনন্দে মনটা ভরে উঠে। মনে হয় সত্যি সত্যি শিক্ষকতা জীবনটা অনেক সুখের, অনেক সন্মানের। এর বিপরীত অভিজ্ঞতাও যে হয়না তাও নয়।

শহীদুল আলম স্যারের আগমন উপলক্ষে আমরা যারা সরকারিকরনের প্রক্রিয়াধীন ছিলাম তাদের মনে যেমন কিছুটা সংশয় কাজ করছিলো তারচেয়ে বেশী দুর্ভাবনা ছিল কলেজের কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে। সবার মনেই তখন ক্যাডার – নন ক্যাডার দ্বন্দ্বের অজানা ভয়। যদিও সেদিন শামীম নিশ্চিত করেছিলো যে উনি খুবই একজন ভালো মানুষ। শামীমের সে কথা যে শুধু কথার কথা ছিলনা তা পরবর্তীতে সবাই উপলব্ধি করে। তিনি যতদিন জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন  সবাইকে নিয়েই চলেছেন। একক কোন সিদ্ধান্ত ক্ষমতা বলে কারো উপর চাপিয়ে দেননি বলেই শুনেছি। প্রত্যেকের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে উপলব্ধি করে সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি চলে যাবার পরও সবাই থাকে মিস করে।কারো কোন অভিযোগ নেই তার উপর।আমরা যারা অবসরে গিয়েছিলাম তার যোগদানের পূর্বেই তাদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজনেও তিনি সার্বিক সহযোগিতা করেন। যদিও এই বিদায় অনুষ্ঠানের উদ্যোগক্তা ছিলেন সুরঞ্জিত কুমার সেন, আব্দুর রউফ সহ আমাদের অন্যান্য প্রাক্তন সহকর্মীরা। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তার সার্বিক সহযোগিতা না থাকলে এই উদ্যোগ কখনো সফল হতো না। আমাদের চাকুরীজীবনে আমাদের বেশ কজন সহকর্মী জগন্নাথপুর কলেজের চাকুরী ছেড়ে অন্যত্র চলে যান কিন্ত তাদের  কারো বিদায় অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি। এই বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজনে যার সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল সেই সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। যাদেরকে আমরা বিদায় দিতে পারিনি তাদের মধ্যে ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের শংকর চক্রবর্তী, ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাসুদ খান, অর্থনীতি বিভাগের ছায়া রানী সাহা, ব্যবস্থাপনা বিভাগের ফনীভুষন আচার্য, জীববিজ্ঞান বিভাগের মারুফুজ্জামান ব্যবস্থাপনা বিভাগের হরমুজ আলী এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের নজরুল ইসলাম।
শহীদুল ইসলাম ১৬ তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক হিসাবে সরকারি চাকুরীতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে  সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সিলেট সরকারি কলেজ, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের শ্রীধরপাশা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ ইউনুস আলী ও মায়ের নাম সৈয়দা জয়গুন নেছা। তাঁর দুই ভাই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও এক ভাই দুই বোন যুক্তরাজ্য প্রবাসী এবং এক ভাই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। অর্থ, বিত্ত, ভৈবব কোন কিছুই তার চিত্তকে কুলষিত করতে পারেনি। এখানেই তার অন্যন্যতা। তার নেতৃত্ব সিলেট শিক্ষা বোর্ডের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি এবং তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবনের জন্য প্রার্থনা করি।
লেখক-সহকারী অধ্যাপক (অবঃ)
জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে। 

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর
জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬
Design & Developed By ThemesBazar.Com