1. forarup@gmail.com : jagannthpur25 :
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে ২৮ শিশুসহ নিহত ২৯ ভারতীয় উপমহাদেশে দেবী দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতি- প্রতাপ চৌধুরী  ইতালির কথা বলে লিবিয়া নিয়ে নির্যাতন, টাকায়ও মেলে না মুক্তি সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: প্রধানমন্ত্রী ‘নতুন জীবনের’ খোঁজে বাড়ি থেকে পালানো ৪ স্কুলছাত্রী হবিগঞ্জে উদ্ধার মানুষ নিজেই আল্লাহর কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তিতে থাকছে ১৪ শতাংশ কোটা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে তৃণমূল উন্নয়নে গতি আসছে: মিজান চৌধুরী জগন্নাথপুরে দুই দোকানিকে ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড গাজীপুরে ওষুধ কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে সেনাবাহিনী

ইতালির কথা বলে লিবিয়া নিয়ে নির্যাতন, টাকায়ও মেলে না মুক্তি

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ Time View

জগন্নাথপুর২৪ ডেস্ক::

‘ও ভাই, কোন জায়গায় গেলে বিচার পাব? সরকার কী দেখছে না? এই মাফিয়ার বিচার করবে কারা? আমারে নিঃস্ব করে ফেলছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদছিলেন মিজানুর রহমান (৪০)। ইতালি পাঠানোর নামে তাঁকে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় নিয়ে মাসের পর মাস নির্যাতন চালায় মানব পাচারকারী চক্র। সেখান থেকে বাঁচতে তিন দফায় পরিবারকে দিতে হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। ঋণ-জমি বিক্রি করে জোগানো এই টাকা দিতে গিয়ে সব হারিয়েছেন তারা।

গতকাল বুধবার ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘নির্যাতিত ও নিপীড়িত সাধারণ মানুষে’র ব্যানারে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এসেছিলেন মিজানুর। তাঁর মতো মানব পাচারকারী চক্রের হাতে সর্বস্ব হারানো কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা এর আয়োজন করেন। মানববন্ধন শেষে তারা মাফিয়া চক্রের বিচার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেন।

মিজানুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার ফুলসূতি ইউনিয়নের ফুলসূতি গ্রামের গেন্দু মাতুব্বরের ছেলে। ২০২৫ সালে ইতালি যাওয়ার জন্য দেশ ছাড়েন তিনি। তাঁকে লিবিয়ায় নিয়ে বন্দি করে চালানো হয় নির্যাতন। মিজানুরকে বাঁচাতে তিন দফায় পরিবারকে দিতে হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্যাতনের শিকার হয়ে একই জেলার ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের জাঙ্গালপাশা গ্রামের সালাম মাতুব্বরের ছেলে হাবিব মাতুব্বর (৪০) মারা যান। তাঁর মরদেহ যখন ফেলতে যায় নির্যাতনকারীরা, তখন অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে জানালা ভেঙে পালাতে সক্ষম হন মিজানুর। পরে দেশটির পুলিশের কাছে ধরা দেন তারা। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে গত আগস্ট মাসের শেষ দিকে দেশে ফেরেন তিনি।

গতকালের মানববন্ধনে অংশ নিতে এসেছিলেন হাবিব মাতুব্বরের স্ত্রী তাসলিমা বেগম। তিন সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাসলিমা বলেন, ‘মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা দিতে না পারায় আমার স্বামীরে মুরাদ (পাচারকারী) মাইর‍্যা ফেলছে। আমার স্বামীর এক শতাংশ জায়গা ছিল, সেই জমিও বিক্রি করে দিসি। বর্তমানে তিন সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেছি। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’

ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, ইতালি নেওয়ার নামে লিবিয়ায় নিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য নির্যাতনকারী চক্রের এদেশীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন মুরাদ বেপারী (৪০) নামের এক ব্যক্তি। তিনি জেলার নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের মোহাম্মাদ বেপারীর ছেলে। তাঁর সহযোগী হিসেবে স্ত্রী তানিয়া আক্তার (৩৫), একই উপজেলার ফুলসূতি গ্রামের বকুল মাতুব্বর (৫০), ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের বাড়ৈইহাট গ্রামের আনোয়ার শেখ (৩৮), মনির মাতুব্বর (৩৪), আসলাম ও শাহিন নামে আরও দুজনের নাম জানা গেছে। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে এই ব্যক্তিরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে মুরাদ বেপারীর যোগাযোগ করিয়ে দেন।

হাবিব মাতুব্বরের স্বজনেরা জানান, তারা এই চক্রটির ফাঁদে পড়েন ২০২৩ সালে। ওই বছর ইতালির নাম করে হাবিবকে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। কথা ছিল ২০ লাখ টাকা দিতে হবে মুরাদকে। পরে লিবিয়ায় নিয়ে তাঁকে বন্দি করে নির্যাতন চালানো হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দ্বিতীয় দফায় নেওয়া হয় আরও ১০ লাখ। এরপরও মুক্তি মেলেনি হাবিবের। পরিবারের কাছে দাবি করা হয় আরও ১০ লাখ টাকা। সেই টাকা

দিতে পারেননি স্বজনেরা। এ কারণে হাবিবকে নির্যাতন করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির কোনো সময় হত্যা করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বজনেরা পান তাঁর মৃত্যুর সংবাদ।
হাবিবের সঙ্গে একই ঘরে বন্দি ছিলেন আজিজুল ইসলাম। তিনি সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের দরিকৃষ্ণনগর গ্রামের শামসুদ্দিন মোল্যার ছেলে। চক্রটির কাছে আজিজুল ও তাঁর পরিবার খুইয়েছে ২৭ লাখ টাকা। হাবিব মাতুব্বরকে হত্যার পর যে ২৫ বন্দি জানালা ভেঙে পালিয়ে যান, তাদের একজন আজিজুল। তিনি নির্মম নির্যাতন ও পরবর্তী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমাদের তিন দিন

না খাইয়ে রাখা হয়। এক রাতে এসে প্রচুর মারধর করে। তখন হাবিব মারা যায়। এরপর একটি গাড়িতে করে হাবিবের লাশ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দিতে যায়। ওই সুযোগে আমরা জানালা ভেঙে পালিয়ে এক লিবিয়ানের বাসায় আশ্রয় নিই। তখন ওই ব্যক্তি পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে নিয়ে যায়।’ পরে পর্যায়ক্রমে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন তারা।

উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে ফরিদপুরের অন্তত ১৫টি পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মাফিয়া চক্রটি। তাদের লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়ে টাকা আদায় করা হয় পরিবারের কাছ থেকে। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় হত্যা করা হয় হাবিবকে। এই চক্রের মাধ্যমে যাওয়া অনেকের খোঁজ এখনও পাচ্ছেন না স্বজনেরা।

মানববন্ধনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে তিন বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের মোস্তফা মাতুব্বরের ছেলে আল-আমিন মাতুব্বর (২২), নাড়ুহাটি গ্রামের শাওন মাতুব্বর (২০) ও ফুলসূতি গ্রামের সোবহান মোল্যার ছেলে মাফুজসহ (২০) কয়েকজন। এই তিনজনের স্বজনের দেওয়া তথ্যমতে, আল-আমিনের পরিবার ১৯ লাখ, শাওনের পরিবার ১৫ লাখ ও মাফুজের পরিবার থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

এসব ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা মামলা করলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। এমনকি উল্টো তাদের নামে মিথ্যা মামলা ও হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

নিখোঁজ আল-আমিনের মা চামেলী বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আজ তিন বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছে, কী অবস্থায় রয়েছে আজও জানতে পারি নাই। আমি শুধু ছেলেটার সন্ধান চাই।’

চক্রটির হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে চলতি বছরে লিবিয়া থেকে অভিবাসন সংস্থার মাধ্যমে দেশে এসেছেন অন্তত ১১ জন। তারা সবাই অংশ নেন গতকালের মানববন্ধনে। তাদের মধ্যে মিজানুর ও আজিজুলের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যরা হলেন– নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের গহেরপুর গ্রামের সেখেন শেখের ছেলে রমজান শেখ (৩৫), সদরবেড়া গ্রামের মুন্নাফ মাতুব্বরের ছেলে আয়নাল মাতুব্বর (৪০); রামনগর ইউনিয়নের শ্রাঙ্গাল গ্রামের শেখ সামাদের ছেলে রাসেল মাতুব্বর (২১) ও জাহিদ পুরার ছেলে সালমান পুরা (২০); ডাঙ্গী ইউনিয়নের গোহাইলপোতা গ্রামের ইয়াদ আলী মাতুব্বর (৩৯), ফুলসূতি গ্রামের হামেদ মাতুব্বরের ছেলে নজরুল ইসলাম মাতুব্বর (৩০); ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের জাঙ্গালপাশা গ্রামের ফারুক মাতুব্বর (৩৮), হামিরদি ইউনিয়নের ভীমেরকান্দি গ্রামের নাসির শেখ (৪২) এবং ফরিদপুর সদরের কানাইপুর ইউনিয়নের ভাটি কানাইপুর গ্রামের শামীম শেখ (৪০)। তাদের কাছ থেকে যথাক্রমে ২০ লাখ, ১৪ লাখ, ২০ লাখ, ২০ লাখ, ১৭ লাখ, ২৫ লাখ, ৩০ লাখ, ৩৫ লাখ ও ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

মানববন্ধনে এই ব্যক্তিরা জানান, তাদের সবার পরিবার জায়গা-জমি, স্বর্ণালংকার বিক্রি করে ও ধারদেনা করে চক্রটির হাতে টাকা তুলে দেন। তাদের আশা ছিল, ইতালি গিয়ে আয়-রোজগার করে ঋণ শোধ করবেন, পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাবেন। কিন্তু ইতালি না নিয়ে তাদের লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করেছে। এসব বন্দিশালায় দেশের বিভিণ্ন এলাকার আরও শতাধিক মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও জানান তারা।

তারা বলছেন, তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে চক্রের হোতা মুরাদ বেপারী গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল বাড়ি করেছেন। তারা জানতে পেরেছেন, বাড়িটি গোপনে বিক্রি করে দেশ ছাড়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। এ অবস্থায় তারা মুরাদ বেপারী ও তাঁর সহযোগীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য মুরাদ বেপারীর লিবিয়ান নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল ও খুদেবার্তা দিলেও সাড়া মেলেনি। অন্য সহযোগীদের নম্বরে কল দিলেও কেউ ধরেননি।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল আজমের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের কাছে অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া কেউ মামলা করে থাকলে সেই মামলার খোঁজ নেবেন। তিনি তদন্তের পর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সূত্র-সমকাল

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর
জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬
Design & Developed By ThemesBazar.Com