স্টাফ রিপোর্টার-
এমন ঘনঘোর বরিষায় বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল কিংবা বসন্তের আগমনী বার্তায় সবার আগে যে নামটি মনে আসে, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলার ঋতু, প্রকৃতি আর গ্রামীণ সৌন্দর্যকে সার্থকভাবে কাব্য, গীতির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি। বাঙালি সংস্কৃতিতে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে কবিগুরুর ছোঁয়া লাগেনি। জীবন চলার পথের সব অনুভূতিকে বৈচিত্র্যময় ভাষা আর শব্দের মাধ্যমে কালি ও কলমে প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রেম, রোমাঞ্চ, ভালোবাসা কিংবা বিরহ প্রকাশে তিনি যেন অপরিহার্য। তাই তো বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
নিজের অসামান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে বিশ্বকবির খেতাবটিও অর্জন করেছেন এই কবি। রবীন্দ্রনাথের কারণেই বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালি জাতির পরিচিতির বিস্তৃতি ঘটেছে। তিনিই বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে কালজয়ী চিহ্ন রেখে গেছেন বলে তার সৃষ্টিকর্ম বারবার বাঙালি জাতির মানসপটে নিয়ে আসে তাকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানে গানে বলেছিলেন-‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসিখেলায়/ আমি যে গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়। /মনে রেখো।’ বাঙালি মানসে রবীন্দ্র্রনাথের উপস্থিতি চিরকালের, চিরজীবনের। তিনি মৃত্যুকে জীবনেরই অপর নাম হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। মানুষকে ভালোবেসে, মানুষের ভালোবাসা পাবার ঘটনা জীবনের ‘অমূল্য দান’ হিসেবে অকপটে বলেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘এ বিশ্বেরে ভালোবাসিয়াছি/ এ ভালোবাসাই সত্য এ জন্মের দান/ বিদায় নেবার কালে/ এ সত্য অম্লান হয়ে মৃত্যুরে করিবে অস্বীকার।’
আজ বাইশে শ্রাবণ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮০তম প্রয়াণ বার্ষিকী। তার প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এই প্রিয় ঋতুতেই নির্বাপিত হয়েছিল কবির জীবনপ্রদীপ। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখা এই কবির মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেদিন শোকাহত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারের কোলে/বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে/শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।’ রবীন্দ্রনাথ অবশ্য জন্ম-মৃত্যুর মাঝে খুব সামান্যই তফাত দেখেছেন। আর তাই তো তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যু দিয়ে যে প্রাণের/মূল্য দিতে হয়/সে প্রাণ অমৃতলোকে/মৃত্যুকে করে জয়।’ আশি বছরের জীবন সাধনায় মৃত্যুকে নিয়ে গভীর জীবন তৃষ্ণায় তিনি লিখেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য নতুন রূপ লাভ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। তার লেখা বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে বাংলা সাহিত্যকে। সবার কাছেই তিনি মানবমুক্তির বারতা নিয়ে উদ্ভাসিত। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল ফাউন্ডেশন তার এই কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ রূপে। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাক-ের প্রতিবাদে ওই উপাধি প্রত্যাখ্যানও করেন তিনি। শিক্ষানুরাগী রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাবিস্তারে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
প্রসঙ্গত, বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ, ইংরেজি ১৮৬১ সালের ৮ মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
Leave a Reply