1. forarup@gmail.com : jagannthpur25 :
সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ যুক্তরাজ্যে রেফারি সার্ভিস অ্যাওয়ার্ডে ভুষিত হলেন জগন্নাথপুরের ফটিক মিয়া  দেশে রেকর্ড ৩৬৭১ মেগাওয়াট লোডশেডিং প্রযুক্তির যুগে সময়ের অপচয় ও সচেতনতা দেশের মানুষ যাতে শান্তিতে থাকতে পারে, সেটিই প্রধান লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রী জগন্নাথপুরে মৎস্য ফিশারি থেকে পাহাড়াদারের লাশ উদ্ধার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলের প্রার্থী কর্নেল অলি জো বাইডেনের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে ‘চরম যন্ত্রণাদায়ক’ ক্যানসার দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে আরেক ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ২ জগন্নাথপুরে নৌকা ডুবিতে চার জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় উপজেলা বিএনপির শোক

হেমন্তের প্রকৃতিতে ছড়ানো প্রভুর প্রেম

  • Update Time : শুক্রবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৯
  • ৩৭১ Time View

বাংলার প্রকৃতিতে এখন বিরাজ করছে সুমঙ্গলা হেমন্ত। ঋতুর রানী শরতের প্রস্থানের পরই হিমবায়ুর পালকি চড়ে হালকা কুয়াশার আঁচল টেনে আগমন হয়েছে তার। প্রকৃতিতে ফুটে ওঠেছে সুন্দর রূপবিভা। হরিদ্রাভ সাজবরণ করেছে পত্রপল্লব। কাঁচা সোনার রং লেগেছে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠে।

মাঠে মাঠে শুরু হয়েছে ধান কাটার ধুম। ধানের মউ-মউ গন্ধে ভরে উঠছে চারদিকে। স্তূপ দেখে এবাড়ি-ওবাড়ি। উঠোন ভরা সোনালি ধানের স্তূপে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে আসে বান্দার শির।

কারণ এ নিয়ামত যে তারই কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। তিনিই আপন কুদরতে শক্ত মাটির বক্ষ চিরে অক্ষতাবস্থায় এ ফসল আর ফলফলাদির ব্যবস্থা করেন। পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের জন্য মাটিকে ব্যবহার উপযোগী করে দিয়েছেন…।’ (সূরা মূলক : ১৫)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক, আমি তো অঝোরধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। তারপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি। আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাকসবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষবিশিষ্ট বাগান, ফলফলাদি ও ঘাস। এসব তোমাদের ও তোমাদের পালিত পশুকুলের জীবন ধারণের জন্য।’ (সূরা আবাসা : ২৪-৩২)

হেমন্ত মানেই নব উচ্ছ্বাস, নব সুর, নব শিহরণ। হেমন্তের নবজাগরণে কাননে কাননে ফোটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, পদ্ম, হাসনাহেনা, হিমঝুরি, দেবকাঞ্চন, রাজ-অশোকসহ নানা রং ও ঘ্রাণের অসংখ্য জাতের ফুল। সেসব ফুলের পাপড়ি ও গাছের পাতায় পাতায় ভোরের মৃদু শিশিরের স্পর্শ জানিয়ে দেয় শীত আসছে। তাই হেমন্তকে বলা হয় শীতের পূর্বাভাস।

কার্তিক আর অগ্রহায়ণ, এ দুই মাস হেমন্তের হলেও হেমন্ত ততটা স্থায়িত্বের হয় না। হেমন্তের যৌবন খুবই অল্প সময়ের। এ অল্প সময়েই হেমন্ত তার রূপমাধুরীতে রাঙিয়ে দেয় প্রকৃতির প্রতিটি প্রহর। হেমন্তের সকালগুলো যেন। হাঁসের পালকের মতো কোমল। জলজ বাতাসে গায়ে মাখা হিমঝুরির পাগল করা ঘ্রাণ। শব্দহীন ঝরেপড়া শিশিরধৌত সকাল অমৃত। সত্যিই অমৃত। কবি সুফিয়া কামালের ভাষায়,

‘হেমন্ত তার শিশির ভেজা

আঁচল তলে শিউলি বোঁটায়

চুপে চুপে রং মাখাল

আকাশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায়।’

হেমন্তের প্রতিটি প্রহরই যে মুগ্ধতার। হেমন্তের ঘুঘু ডাকা দুপুর, বাঁক খেয়ে ধানক্ষেতে নেমে আসা বালিহাঁসের ঝাঁক, কাকতাড়ুয়ার মাথায় বসে থাকা ফিঙে, শেষ বিকালে পশ্চিম আকাশ রাঙিয়ে দেয়া সাত রঙের রংধনু। আর ভাবুক সন্ধ্যার প্রফুল্লতা ছেয়ে যায় মানুষের ভেতর জগৎ। জ্যোৎস্না ডুবানো আলোকিত রাতও যে প্রকৃতিকে করে তোলে লাস্যময়ী। হেমন্তের এমনই মায়াময় প্রকৃতি মানব মননে অদ্ভুত তন্ময়তার সৃষ্টি করে। সেই তন্ময়তায় জেগে ওঠে প্রেম। এ প্রেম যেমন ঐশ্বরিক, তেমনই স্রষ্টার নিপুণ সৃষ্টি প্রকৃতির।

তাই তো আল্লাহ সবুহানাহুতায়ালা প্রকৃতিকে নিয়ে ভাবতে বলেছেন। সাধকরাও বলেছেন, ‘প্রকৃতির মাঝেই খোঁজ মেলে স্রষ্টার।’ হজরত হাসান বসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে এক ঘণ্টা পরিমাণ চিন্তাভাবনা করা সারা রাত ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’

সত্যিই! প্রকৃতির দিকে তাকালেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে আল্লাহর অসীম কুদরতের খেলা। পবিত্র কোরআনেও প্রকৃতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃজনে এবং দিন-রাতের পরিবর্তনে সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে আল্লাহর জিকির করে এবং নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃজন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। (তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়) হে আমার প্রতিপালক! আপনি এগুলো বৃথা সৃষ্টি করেননি। আপনি (বৃথা সৃষ্টি করার দোষ থেকে) পবিত্রতম। (সূরা আল ইমরান : ১৯১-১৯২)

হেমন্তের রূপরসে সবচেয়ে বেশি আপ্লুত হয়ে ওঠেন কবি সাহিত্যিকরা। তাদের যাযাবর মনের অলিগলিতে খেলা করে নিত্যনতুন সৃষ্টি। সেই মধ্য যুগেই হেমন্ত তার আপন রূপমায় বাংলাসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। মধ্য যুগের কবি কংকন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত ‘কালকেতু’ উপাখ্যানেই প্রথম দেখা মেলে হেমন্তের। কবির ভাষায়, ‘কার্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ/যগজনে করে শীত নিবারণ বাস।’

তবে শৈল্পিকতায় উৎকর্ষিত হয়েছে রবীন্দ্র-নজরুল যুগে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশদের মতো সাহিত্যিকদের সুনিপুণ হাতের স্পর্শে বাংলাসাহিত্যে হেমন্ত বন্দনা উৎকর্ষিত হয়ে ওঠে।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের কাছে হেমন্ত ধরা দিয়েছে আধ্যাত্মদর্শনরূপে। প্রকৃতির আভায় কবির চিত্তে যে অনাবিল প্রশান্তির দুল খায়, তা হচ্ছে স্তব্ধতা। তাই রবীন্দ্রনাথ তার নৈবেদ্য স্তব্ধতায় বলেছেন, ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার/রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার/স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’

হেমন্তের আগমনী, এর প্রকৃতি ও স্বভাবের এক চঞ্চল রূপ ফুটে ওঠে নজরুলের ‘অঘ্রানের সওগাত’ কবিতায়। তিনি লিখেছেন, ‘ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণির সওগাত?/

…মাঠের সাগরে জোয়ারের পরে লেগেছে ভাটির টান।/রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশিতে ঝুরিছে আমন ধান!’

হেমন্তের এই মায়াময় রূপবিভা কবি জীবনানন্দকে টেনেছে জাদুর কাঠির মতো।

সে জন্যই কবি বারবার এ কার্তিকের সময়েই ফিরে আসতে চেয়েছেন-

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়, হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে/হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়’।

হেমন্তের আরেক আনন্দের নাম নবান্ন। একটা সময় ছিল, যখন নবান্নের উৎসবে গ্রামবাংলার লোকেরা মেতে উঠত। ধনী-গরিব সবাই মিলে অগ্রহায়ণের প্রথম বৃহস্পতিবার পালন করত নবান্নের উৎসব। গাঁয়ের বধূরা গুড়, নারকেল, কলা, দুধ ইত্যাদির সঙ্গে নতুন আতপ চাল মিশিয়ে ক্ষীর রাঁধতেন। জনে জনে তা বিলাতেন। এতে ধনী-গরিব সবার মধ্যে তৈরি হতো সম্প্রীতির এক সুদৃঢ় বন্ধন। আর ইসলামও মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনা উৎসবকে উৎসাহিত করে। তবে কথা হচ্ছে, এ উৎসবের ব্যাপারে আমাদের খুব সচেতন থাকতে হবে। কোনোভাবেই যেন তা সীমালঙ্ঘন না করে।

আফসোস, হেমন্তের সেই নবান্ন যেন আজ কালের গর্ভে বিলীন হওয়া এক অতীতেরই নাম। তাই আজ হেমন্ত এলেও নিঃস্ব হয়ে ফেরে মন। কবির ভাষায়,

কোথায় আমন ধানের ঘ্রাণে প্রাণকাড়া সেই দৃশ্য

রূপ হারিয়ে সুমঙ্গলা হেমন্ত আজ নিঃস্ব।’

#  আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

লেখক : প্রাবন্ধিক

সৌজন্যে যুগান্তর

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬
Design & Developed By ThemesBazar.Com