তাই আমরা প্রত্যেকে প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল—আমাদের জীবন, রিজিক, সুস্থতা, নিরাপত্তা ও সফলতা সবই তাঁর দানের অন্তর্ভুক্ত। কেননা মুমিনের আত্মমর্যাদা হলো মানুষের কাছে নিজেকে হীন না করে সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
চাওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহকেই অগ্রাধিকার দেওয়া : মহানবী (সা.) সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে এমন কিছু অমূল্য উপদেশ দিয়েছিলেন, যা একজন মুমিনের সারাজীবনের পথনির্দেশনা হতে পারে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘‘যখন তুমি কিছু চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে।
মানুষ কোনো প্রয়োজনের সম্মুখীন হলে তার প্রথম আশ্রয় হওয়া উচিত আল্লাহর দরবার। চাকরি, জীবিকা, সুস্থতা, পারিবারিক শান্তি, বিপদ থেকে মুক্তি কিংবা কোনো কল্যাণ লাভের জন্য তাঁর কাছেই প্রার্থনা করা উচিত। কেননা মানুষ সহযোগিতা করতে পারে আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্য ও সুযোগের মাধ্যমে। যেমন, একজন মুমিন চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেন, যোগ্য ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ করেন, প্রয়োজনে আত্মীয়স্বজনের সহায়তা নেন; কিন্তু তার হৃদয় বিশ্বাস করে, সব উপকরণের ঊর্ধ্বে আল্লাহর ইচ্ছাই কার্যকর।
মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে আত্মমর্যাদা রক্ষা উত্তম : ইসলাম মানুষকে পরিশ্রম, আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা দেয়। প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অহেতুক মানুষের কাছে চাওয়া এবং বারবার নিজের অভাব তুলে ধরে সাহায্য আদায় করার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করে। আল্লাহ তাআলা অভাবী অথচ আত্মসম্মান রক্ষাকারী মানুষের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে চায় না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৩)
এখানে আল্লাহ এমন অভাবী মানুষের প্রশংসা করেছেন, যারা অভাবের মধ্যেও আত্মমর্যাদা বজায় রাখেন এবং মানুষের কাছে বারবার হাত পাতেন না। তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনের কথা সবাইকে জানিয়ে বেড়ান না; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধারণ করেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪২৭)
এই হাদিসের আলোকে একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী উপার্জন করা, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা এবং সম্ভব হলে অন্যের উপকারে এগিয়ে আসা। যে ব্যক্তি আজ অভাবের কারণে সাহায্য গ্রহণ করছেন, তিনিও ভবিষ্যতে সামর্থ্যবান হলে অন্যকে সাহায্য করতে পারেন।
আল্লাহর ওপর ভরসা মানে মানুষের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা নয় : তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসার অর্থ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। একজন মুমিন চেষ্টা করেন, পরিকল্পনা করেন, পরামর্শ নেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা গ্রহণ করেন; কিন্তু কোনো মাধ্যমকেই আল্লাহর বিকল্প মনে করেন না। মহানবী (সা.) বলেন, ‘উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
আল্লাহর ওপর আস্থা : অনেক সময় মানুষ নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য ক্ষমতাবান ব্যক্তি, ধনী আত্মীয় কিংবা প্রভাবশালী মানুষের মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে সত্য কথা বলা থেকে বিরত থাকে। কখনো অন্যায় মেনে নেয়, কখনো নিজের নীতি বিসর্জন দেয়। এর পেছনে কাজ করে মানুষের অসন্তুষ্টির ভয় এবং তাদের অনুগ্রহ হারানোর আশঙ্কা। অথচ মুমিনের কর্তব্য হলো, মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করা, তাদের অধিকার রক্ষা করা এবং বৈধ বিষয়ে সহযোগিতা করা; কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতা করে কারও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা না করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৫)
সারকথা, মানুষের কাছে প্রয়োজনের কথা বলা, বৈধ সাহায্য গ্রহণ করা কিংবা অন্যের সহযোগিতায় উপকৃত হওয়া মানবজীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু নিজের হৃদয়কে মানুষের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলা, প্রয়োজন পূরণের জন্য আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেওয়া কিংবা আল্লাহর অবাধ্যতা করে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের আত্মমর্যাদা বজায় রেখে জীবনযাপনের তাওফিক দিন এবং সব পরিস্থিতিতে তাঁর ওপর সত্যিকার ভরসা করার শক্তি দান করুন। আমিন। সৌজন্যে কালের কণ্ঠ