জগন্নাথপুর২৪ ডেস্ক::
এখানে হেদায়েত বলতে আল্লাহর নাজিলকৃত কিতাবসমূহ এবং তাঁর প্রেরিত রাসুলদের দিকনির্দেশনাকে বোঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে ভয় ও দুঃখ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে… এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে প্রতিদান।
২. তাকদিরের প্রতি ঈমান আনা : আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ঈমানের একটি অপরিহার্য অংশ হলো তাকদিরের প্রতি ঈমান আনা। মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও কষ্ট-নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের ওপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি তা সৃষ্টি করার আগেই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রাখিনি। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সহজ।
৪. মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা : পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে মানসিক কষ্ট ও দুঃখ থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হিসেবে সৎকর্মের মাধ্যমে নিজের ও অন্যের কল্যাণ সাধনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি ঈমানের ওপর দৃঢ় থাকে এবং মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করে, আল্লাহ তার অন্তরে প্রশান্তি দান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ,’ অতঃপর তারা সেই বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়ে বলে, ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুঃখও কোরো না; বরং তোমাদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সুসংবাদ গ্রহণ করো।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩০)
৫. দান-সদকা করা : পবিত্র কোরআন দান-সদকাকে শুধু আর্থিক ইবাদত হিসেবে নয়, বরং হৃদয়ের প্রশান্তি ও মানসিক শান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও তুলে ধরেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আন্তরিকভাবে দান করে এবং পরে সেই দানের কথা বলে কাউকে অপমান বা কষ্ট দেয় না, আল্লাহ তাকে বিশেষ প্রতিদান ও মানসিক শান্তি দান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, এরপর সেই দানের কথা বলে অনুগ্রহ প্রকাশ করে না এবং কোনো কষ্টও দেয় না, তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬২)
৬. আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ নিবেদন করা : মানসিক কষ্ট দূর করার অন্যতম উপায় হলো— নিজের দুঃখ, কষ্ট ও অসহায়ত্ব একমাত্র আল্লাহর কাছেই নিবেদন করা। এই গভীর সত্যই উপলব্ধি করেছিলেন নবী ইয়াকুব (আ.)। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর দেখা স্বপ্ন অবশ্যই সত্য হবে, তিনি কোথাও জীবিত আছেন এবং একদিন আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের পুনর্মিলন ঘটবে। তাই তিনি মানুষের কাছে নয়, কেবল আল্লাহর কাছেই নিজের শোক নিবেদন করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি বললেন, ‘আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৬)
৭. উত্তম পরিণতির জন্য অপেক্ষা করা : উহুদের যুদ্ধের ঘটনা। যুদ্ধের শুরুতে বিজয়ের আশা দেখা দিলেও পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অনেক সাহাবি শহিদ হন, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হারিয়ে যায় এবং সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মহানবী (সা.) শহিদ হয়ে গেছেন। এই সংবাদ মুসলমানদের হৃদয়কে গভীর শোক ও হতাশায় নিমজ্জিত করেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন তারা স্বচক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জীবিত দেখতে পেলেন, তখন তাদের হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে এবং আগের বহু দুঃখ যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর তিনি তোমাদের এক দুঃখের পর আরেক দুঃখ দিলেন, যাতে তোমরা যা হারিয়েছ কিংবা যে বিপদ তোমাদের ওপর এসেছে, তার জন্য অতিরিক্ত শোকাহত না হও।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৩)
৮. বিশ্রাম করা : ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতার সময় সাময়িক তন্দ্রা বা বিশ্রামও আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ। গভীর উৎকণ্ঠায় ক্লান্ত মন ও দেহ যখন কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম পায়, তখন মানুষের অন্তরে নতুন করে সাহস, প্রশান্তি ও স্থিরতা ফিরে আসে। তাই মানসিক চাপে সাময়িক বিশ্রাম আল্লাহর রহমতেরই একটি প্রকাশ। উহুদের যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর এই অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অতঃপর সেই দুঃখ-কষ্টের পর তিনি তোমাদের ওপর নিরাপত্তাস্বরূপ এক ধরনের তন্দ্রা নাজিল করলেন, যা তোমাদের একটি দলকে আচ্ছন্ন করেছিল।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৪)
৯. নেককারদের সঙ্গ লাভ করা : একজন নেককার ও ঈমানদার সঙ্গী মানুষের জীবনে আল্লাহর বড় নিয়ামত। বিপদ ও দুঃখের সময় তিনি হতাশা নয়, আশা জাগান; দুর্বলতা নয়, সাহস সঞ্চার করেন। তিনি আল্লাহর রহমত, তাঁর সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এবং তাঁর সর্বব্যাপী তত্ত্বাবধানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যেমন গুহায় আবু বকর (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘দুঃখ কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : তাওবাহ, আয়াত : ৪০)
১০. প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো : মারইয়াম (আ.)-এর কঠিন পরীক্ষার সময় আল্লাহ তাঁকে একদিকে যেমন মানসিক সান্ত্বনা দিয়েছেন, তেমনি দিয়েছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার নির্দেশনা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তখন তাঁর নিচের দিক থেকে একজন তাঁকে ডেকে বললেন, ‘তুমি দুঃখ কোরো না। তোমার প্রতিপালক তোমার পায়ের নিচে একটি ঝরনার ব্যবস্থা করেছেন। আর খেজুর গাছের কাণ্ডটি নিজের দিকে নাড়াও; তাতে তোমার ওপর ঝরে পড়বে পাকা ও তাজা খেজুর। অতঃপর তুমি খাও, পান করো এবং চোখ জুড়াও। আর যদি মানুষের মধ্যে কাউকে দেখো, তবে বলে দিও—আমি পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে নীরব থাকার মানত করেছি; তাই আজ আমি কারও সঙ্গে কথা বলব না।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ২৪–২৬)
অতএব, মানসিক কষ্ট মানুষের জীবনের একটি পরীক্ষা, কিন্তু এটি কখনোই জীবনের শেষ কথা নয়। কেননা প্রতিটি সংকটের সঙ্গে রয়েছে সহজতা, প্রতিটি অশ্রুর পর রয়েছে স্বস্তি এবং প্রতিটি অন্ধকারের পর রয়েছে আলোর প্রত্যাবর্তন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক দৃঢ় করে, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করে, ধৈর্য ধারণ করে, বেশি বেশি দোয়া ও জিকিরে নিজেকে নিয়োজিত রাখে, তার হৃদয়ে আল্লাহ এমন প্রশান্তি দান করেন, যা কোনো পার্থিব উপায়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। সৌজন্যে কালের কণ্ঠ