বিশেষ প্রতিনিধি::
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত মৌখিক পরীক্ষার উত্তীর্ণ হয়ে চাকুরিতে যোগদান প্রত্যাশী সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সাতজন বাদ পড়ছেন। তাদের সবার সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। চুড়ান্ত পর্বে এসে বাদ পড়ার খবরে তাঁরা বিস্মিত ক্ষুব্ধ ও হতাশ। অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। দরিদ্র পরিবারের এসব সন্তান নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে গত আট মাস ধরে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন। বৃহস্পতিবার চুড়ান্ত নিয়োগ তালিকা প্রকাশিত হলে সুনামগঞ্জ জেলার ১২০ জন বাদ পড়েন। সব দাপ্তরিক ধাপ শেষ হওয়ার পর কি কারণে বাদ পড়ছেন এ নিয়ে চলছে আলোচনা। সর্বশেষ যাছাই বাছাই পুলিশ ভেরিফিকেশন বাদ পড়ছেন বলে প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরকারি চাকুরি বিধি মোতাবেক পুলিশ ভেরিফিকেশন মুলত প্রার্থীর নৈতিক স্বভাব চরিত্র মামলা মোকদ্দমা, বৈবাহিক অবস্থান, স্হায়ী ঠিকানা জায়গা জমি আছে কীনা এসব দেখা হয়ে থাকে। রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে প্রার্থী ও তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সেই সঙ্গে প্রার্থীর পূনাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত দেখা হয়।
জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের জয়নগর কুশরাই গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান আরিফ উদ্দিন। গত আট মাস ধরে চাকুরিতে যোগদানের অপেক্ষা করছিলেন। বৃহস্পতিবার বাদ পড়ার খবর পেয়ে আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ে তার। আরিফ কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, আমার পরিবার খেটে খাওয়া দরিদ্র পরিবার। অনেক কষ্টে পড়ালেখা করে আমি এ চাকুরি পেয়েছি। আমার চৌদ্দ গোষ্ঠীর কেউ কোন দিন রাজনীতি করেনি। আমাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা মোকদ্দমা নেই। কি অপরাধে আমাকে বাদ দেয়া হলে চিন্তা করে পাচ্ছি না। তিনি একটি মসজিদে ইমামতি করে সংসার চালাচ্ছেন বলে জানান।
কলকলিয়া ইউনিয়নের কালিটেকি গ্রামের পপি রানী দেবনাথ। সিলেট এমসি কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। তাঁর পরিবারের কেউ কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।নেই কোন মামলা মোকদ্দমার ঝামেলা। সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে যোগদানের মুহুর্তে এমন বাদ পড়ার খবরে হতাশ ক্ষুব্ধ ও বাকরুদ্ধ পপি ও তার পরিবার।
একই ইউনিয়নের গোড়ারগাঁও গ্রামের রূপম দাস বলেন, সবাই জানে সরকারি চাকুরী হয়েছে এখন মুখ দেখাতে পারছি না। মনে হচ্ছে কতবড় অপরাধী। তিনি জানান,এমন দুঃসংবাদে পরিবারের লোকজন ভেঙে পড়েছেন।
উপজেলার আশারকান্দি ইউনিয়নের জহিরপুর গ্রামের রিক্তা বেগম জানান আমার স্বামী একজন ব্যবসায়ী। বাবার বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত। কোন ধরনের রাজনীতি কিংবা মামলা মোকদ্দমায় না থাকার পরও কোন অপরাধে বাদ দেয়া হয়েছে তা বুঝতে পারছি না।
আশারকান্দি ইউনিয়নের দিঘলবাক কালানজুড়া গ্রামের আমিন সুহেল কৃষক পরিবারে সন্তান। দুই ভাইয়ের মধ্যে একভাই রাজমিস্ত্রী কাজ করে। বাবা কৃষি কাজ করেন। অনেক কষ্টে দক্ষিণ সুরমা কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টে অনার্স পাশ করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে অনেক পরিশ্রম করে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তার নাম বাদ পড়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ঘোষগাঁও গ্রামের জেবুল মিয়া সিলেট এমসি কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করে চাকুরী প্রত্যাশায় প্রহর গুনছিলেন।সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে মেধাক্রমে উত্তীর্ণ হয়ে বাদ পড়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন।তার দাবি তিনি ও তার পরিবার কোন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয়। কোন ধরনের মামলা মোকদ্দমা ও রাষ্ট্রদ্রোহী কিছু নেই।
কলকলিয়া ইউনিয়নের সুপারমাহমদপুর গ্রামের ব্যবসায়ী সুভাষ দাশের সন্তান সুজন কান্তি দাস
সিলেট এমসি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স শেষ করে সহকারী শিক্ষকের চাকুরি পান। সুজন ও তার পরিবার কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। তাদের কোন মামলা মোকদ্দমা ও নেই। তারপর ও কেন বাদ পড়লেন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। সুজনসহ বাদপড়া সাত জনের দাবি দ্রুত তাদের নিয়োগপত্র প্রদান করে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। অন্যতায় তারা মরণপণ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
ভেরিফিকেশনের সাথে সম্পৃক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, আমরা মুলত প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত বংশ পরিচয় স্হায়ী ঠিকানা রাজনৈতিক মতাদর্শ, মামলা মোকদ্দমা,বৈবাহিক অবস্থান ও শিক্ষা সনদপত্র যাছাই করে প্রতিবেদন দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, সব তথ্য সঠিক থাকার পরও কেউ কেউ বাদ পড়ছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে একাধিক সংস্থা ভেরিফিকেশন করেছে। কেন বাদ পড়ছে আমরা বলতে পারছি না।
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, চলতি সহকারী শিক্ষক নিয়োগে জগন্নাথপুর উপজেলার ৭৯ জন উত্তীর্ণ হম।এরমধ্যে একজন কাগজপত্র জমা না দেয়ায় ৭৮ জন উত্তীর্ণ হন। সর্বশেষ প্রকাশিত নিয়োগপত্রে ৭ জন বাদ পড়েন। ১ অক্টোবর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তরা যোগদান করবেন। ৪ অক্টোবর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদানের পর কর্মস্থলে যোগদিবেন। বাদ পড়াদের বিষয়টি উদ্ধতন কতৃপক্ষ দেখছেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস জগন্নাথপুর টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, চুড়ান্ত যাছাই বাছাইয়ে জেলার ১২০ জন শিক্ষক নিয়োগ প্রত্যাশীর নিয়োগ পত্র আটক রয়েছে। আগামীকালই তাদের বিষয়ে একটি সুখবর আসবে। তিনি বলেন, সঠিক তথ্য থাকলে তারা সবাই নিয়োগপত্র পাবে।