আহমেদ সেলিম – ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের অজপাড়াগাঁ মধুমতি আর বাঘিয়ার নদীর তীরে এবং হাওর-বাঁওড়ের মিলনে গড়ে ওঠা বাংলার অবারিত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারের যে বাড়িতে বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই বাড়ির আদলে সিলেটে নির্মিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু’র বাড়ি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীর বিশেষ দিনকে ঘিরে এ বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের সম্মুখভাগে। তরুণ প্রজন্মের অনেকে বাড়িটি দেখার জন্য ভিড় করছেন সেখানে।
জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে সিলেটে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু উৎসব’। তিন দিনব্যাপী উৎসব উপলক্ষে টুঙ্গিপাড়ার এ বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক এই বাড়ি দিয়ে প্রবেশ করে দর্শকরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনে যাতে প্রবেশ করতে পারে সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বাড়ির ভেতরে চলবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী। যেখানে দুর্লভ আটচল্লিশটি ছবি রাখা হয়েছে। ছবিগুলো দেশ বিদেশের অনেক বিখ্যাত ফটো সাংবাদিকরা তুলেছেন। প্রদর্শনীর ছবির মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য সংগ্রামবহুল জীবনের অধিকারী বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই করে নেয়া স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ মুহূর্তগুলোর কথা বলবে।
আয়োজকরা জানান, বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী বাঙালীর দীর্ঘ ৯ মাস মৃত্যুপণ জনযুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে অর্জিত হয়েছিল মহামূল্যবান স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতার গুরুত্ব বহন করবে ছবিগুলো। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, যারা ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মুহূর্তটি অবলোকন করতে পারেননি, তারা অজানা অনেক কিছু উপভোগ করতে পারবেন এই প্রদর্শনী থেকে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক স্মৃতি রয়েছে সিলেটে। সিলেটে আসার পর তিনি অনেক স্থানে ঘুরেছেন। তারপর যোগ দিয়েছেন, সভা-সমাবেশে। প্রদর্শনীতে সেই দুর্লভ ছবিগুলো স্থান পেয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর অনেক বিখ্যাত ছবি তুলেছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশের কয়েকজন ফটো সাংবাদিক। তার মধ্যে একজন একুশে পদকপ্রাপ্ত পাভেল রহমান। লুঙ্গি-স্যান্ডো গেঞ্জি পরে পাইপ টানছেন- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই বিখ্যাত ছবিটি তুলেছেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষাশহীদদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর শেষবারের শ্রদ্ধা নিবেদন, শেষ জন্মদিনে ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু, কচি-কাঁচার শিশুদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোকচিত্র-সবই বন্দী হয়েছে তাঁর ক্যামেরায়। এই গুণি আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় তোলা হয়েছে ১৯৮২ সালে বাবার কবরে প্রথমবারের মতো মেয়ে শেখ হাসিনার পুষ্পস্তবক অর্পণের ছবি। প্রদর্শনীতে গেলে সেই পাবেল রহমানের ছবিও দেখা যাবে।
গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রতি মমত্ববোধের কারণে পরিণত বয়সে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা। সেই নেতার বাড়ির আদলে বাড়িটি নির্মাণ করেছেন সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থপতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক রাজন দাশ। সহযোগী হিসেবে ছিলেন অমিতাভ নামে আরেক স্থপতি।
স্থপতি রাজন দাশ জানান, ‘প্রদর্শনীর কেন্দ্রটা সাজানো হয়েছে বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির আদলে। তবে ভেতর সাজানো হয়েছে আমাদের নিজেদের মতো করে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী ঘিরে সারা দেশে উৎসব হলেও আমরা ব্যতিক্রমভাবে উৎসবস্থল সাজিয়েছি। দেশের আর কোথাও এভাবে টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর বাড়ির আদলে কাজ হয়নি। যারাই প্রদর্শনী দেখতে আসবেন, তারা ভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধুকে অনুভব করবেন। উৎসবের আয়োজক প্রতিষ্ঠান জেলা পরিষদ সিলেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহ জানান, ‘শিশু কিংবা তরুণ যারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি দেখেনি তাদের জন্য বিশেষ আনন্দের হবে বাড়িটি। একই সাথে বাড়ির ভেতরের প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হবে বঙ্গবন্ধুর ১৯২০ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের নানা পটভূমি।’ সিলেট জেলা পরিষদের আয়োজনে ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তিন দিনব্যাপী উৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
লেখক- আহমেদ সেলিম কবি সাংবাদিক
(দৈনিক সিলেটের ডাক এ র সৌজন্যে)
Leave a Reply