জগন্নাথপুর২৪ ডেস্ক::
অবৈধপথে ইউরোপে পাড়ি জমানোর সময় ভূমধ্যসাগরে খাবার-পানির অভাবে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে আটজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা সবাই সুনামগঞ্জ জেলার।
লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাড়ি জমানোর সময় এই নির্মম ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে তাদের। মিশর উপকূল থেকে জীবিত উদ্ধার করে ১৮ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
নিহত আটজন হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামের হাবিব উল্লাহ (২৪);দিরাই পৌরসভার ঘাগটিয়া গ্রামের সানোয়ার রহমান; শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা শত্রুমর্দনের গ্রামের হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন এবং রনসী গ্রামের মো. তালহা।
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে রানীগঞ্জের বাগময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপুর (২৫) মৃত্যুর খবর প্রচার হলেও টিপুর স্বজনরা জগন্নাথপুর টুযেন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, সে ১২ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে।
জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট রাতে অভিবাসন প্রত্যাশীকে নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে ওই নৌকাটি। তাতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীরা জানান, যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই ঝড়ের কবলে পড়ে ছোট্ট রাবার নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই নৌকাটি নিয়ে বিপজ্জনক যাত্রা অব্যাহত রাখেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে নৌকাটি সাগরে ভাসতে থাকে। এভাবে টানা নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর স্রোতের টানে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছায় বলে তারা জানান। পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হাসপাতালের চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ থানার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি। এ সময় আমাদের উদ্ধার করতে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই ৯ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমরা এখন মারসা মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি আছি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।
এ বিষয়ে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশি গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শরিফ ও স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের বাদরান নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, তারা মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এর মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি।
দূতাবাস আরও জানায়, হাসপাতালে ভর্তি আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি এবং সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আহত বাংলাদেশি নাগরিকরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিশরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আটক বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে নিখোঁজ থাকা যুবকদের বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল্লাহ বলেন, গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পথে এলাকার কেউ নিখোঁজ হয়েছেন বলে আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। এ বিষয়ে আমাদেরকে কেউ কোন তথ্য দেয়নি বা জানাননি।
শান্তিগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা বলেছেন, সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই বিষয়ে কোন তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর মাধ্যমে সুনামগঞ্জ জেলার চারজন মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া নিখোঁজের কোন তথ্য জানা যায়নি। সুত্র- এশিয়া পোষ্ট.