১. জুলুম, সীমা লঙ্ঘন ও মানুষের অধিকার আত্মসাৎ : জুলুম একটি ভয়াবহ ও দুরারোগ্য ব্যাধি। যখন কোনো সমাজে জালিম সম্মানিত হয় আর মজলুম অপমানিত হয়, যখন মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারস্পরিক লেনদেনে ন্যায়বিচারের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে, আসমান তার বরকত আটকে রেখেছে এবং জমিন তার কল্যাণ লুকিয়ে ফেলেছে। সমাজের ধ্বংসের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।
আদ জাতির কথা চিন্তা করুন। তারা পৃথিবীতে শক্তি ও অহংকারের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং তাদের নবীদের ওপর সীমা লঙ্ঘন করেছিল। পরিণামে তাদের ওপর এমন এক ধ্বংসাত্মক বাতাস পাঠানো হয়েছিল, যা তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর এসব জনপদ—তারা যখন জুলুম করেছিল, তখন আমি তাদের ধ্বংস করেছিলাম এবং তাদের ধ্বংসের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করেছিলাম।
২. অশ্লীলতার বিস্তার ও মাদকদ্রব্যের প্রসার : যে সমাজ অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতাকে বৈধ বা স্বাভাবিক করে নেয়, সেই সমাজ যেন নিজের গলা থেকে ঈমানের বন্ধন খুলে ফেলে। কারণ ঈমান আনুগত্যের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহর মাধ্যমে হ্রাস পায়।
যখন সমাজে অশ্লীলতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, সৎ ও ভালো মানুষের ব্যাপারে মানুষের ধারণা খারাপ হয়ে যায় এবং যারা মানুষের সম্মান ও চরিত্র নিয়ে খেলাধুলা করে, তাদের আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করা হয়, তখন আল্লাহর ক্রোধ নেমে আসে এবং মানুষ দুনিয়াতেই শাস্তির স্বাদ পেতে শুরু করে।
মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, কোনো জাতির মধ্যে যখনই প্রকাশ্যভাবে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে এমন মহামারি ও রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না।
এটা অনস্বীকার্য যে এমন একটি জাতি বা সমাজ, যার সন্তানরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে ব্যস্ত হয়ে যায়, সেই সমাজ ধ্বংসের সহজ শিকারে পরিণত হয়।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ও পারিবারিক কাঠামোর ভাঙন : ইসলাম মানুষের সমাজকে চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ওপর প্রতিষ্ঠা করেনি; বরং ইসলাম সমাজের ভিত্তি করেছে পরিবারকে। আত্মীয়তার দৃঢ় বন্ধনের মাধ্যমে পরিবারকে শক্তিশালী করেছে। এরপর এই সম্পর্কের পরিধি প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে, যাতে সমাজে ভালোবাসা ও দয়া পূর্ণতা লাভ করে।
কিন্তু যখন এসব মূল্যবোধ উল্টে যায়, যখন সন্তান তার মা-বাবার অধিকার জানে না, যখন বাবা তার সন্তানদের খোঁজ রাখে না, যখন ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের সম্পর্ক উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ বা অন্যের নিয়ামতের প্রতি হিংসার কারণে ছিন্ন হয়ে যায়, তখন পুরো সামাজিক দেহ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভেতর থেকে ক্ষয় হতে শুরু করে। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা কি এ থেকে এড়িয়ে চলবে যে তোমরা ক্ষমতা লাভ করলে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? তারাই তারা, যাদের ওপর আল্লাহ অভিশাপ করেছেন; অতঃপর তিনি তাদের বধির করেছেন এবং তাদের দৃষ্টিশক্তি অন্ধ করে দিয়েছেন।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২২-২৩)
অতএব, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কোনো ছোটখাটো ক্ষমাযোগ্য অপরাধ নয়। এটি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং অন্তর্দৃষ্টি হারানোর কারণ হতে পারে। আর যখন কোনো সমাজ থেকে সঠিক অন্তর্দৃষ্টি ও বিবেক হারিয়ে যায়, তখন মানুষ কাদার মধ্যে অন্ধের মতো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলতে থাকে। তখন সেই সমাজের ধ্বংস আর কোনো প্রশ্ন নয়; শুধু সময়ের ব্যাপার।
৪. সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ পরিত্যাগ এবং নসিহত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া : এটি একটি অত্যন্ত গোপন ব্যাধি। বরং এটি সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাধিগুলোর একটি। কারণ এটি সামাজিক বিবেকের মৃত্যুর লক্ষণ। তখন মানুষ এমন হয়ে যায়, যেন দুর্গন্ধযুক্ত মৃতদেহ—একে অপরের অন্যায় দেখে তারা আর বিচলিত হয় না। বরং অন্যায় তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং ভালো কাজ তাদের কাছে অদ্ভুত বলে মনে হয়। প্রত্যেক প্রতিবেশী যখন পাশের বাড়ির মানুষের ওপর নির্যাতন দেখে নীরব থাকে, প্রত্যেক শিক্ষক যখন তার ছাত্রদের নৈতিক অবক্ষয় দেখে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তখন সে অকল্যাণের দলের সঙ্গে সমাজের ধ্বংসের রেখা নিজের হাতেই এঁকে দিচ্ছে।
কেউ নিজে শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে, এটা ভেবে লাভ নেই। কারণ সমাজ নামের জাহাজ যদি ডুবে যায়, তাহলে সেই জাহাজের সব যাত্রীই ডুবে যায়—তারা সৎ হোক বা অসৎ। নোমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং যে সীমা লঙ্ঘন করে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই যাত্রীদলের মতো, যারা লটারির মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। তাদের কেউ স্থান পেল ওপরতলায় আর কেউ নিচতলায়। (পানির ব্যবস্থা ছিল ওপরতলায়) কাজেই নিচের তলার লোকেরা পানি সংগ্রহকালে ওপরতলার লোকদের ডিঙিয়ে যেত। তখন নিচতলার লোকেরা বলল, ওপরতলার লোকদের কষ্ট না দিয়ে আমরা যদি নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে নিই (তাহলে ভালো হয়)। এ অবস্থায় তারা যদি এদের আপন মর্জির ওপর ছেড়ে দেয়, তাহলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা এদের হাত ধরে রাখে (বিরত রাখে), তাহলে তারা এবং সবাই রক্ষা পাবে। (বুখারি, হাদিস : ২৪৯৩)
এতে বোঝা যায়, একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর অন্যায় কাজের পরিণতি অনেক সময় পুরো সমাজকে ভোগ করতে হয়। জাহাজের ছিদ্র যেমন সবাইকে ডুবিয়ে দেয়, তেমনি সমাজে ছড়িয়ে পড়া পাপ ও অপরাধও সামষ্টিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
৫. দুনিয়া নিয়ে গর্ব করা এবং আখিরাত সম্পর্কে গাফিল হয়ে যাওয়া : যখন কোনো সমাজ হৃদয়ের জীবনকে বাদ দিয়ে পেটের জীবনকে প্রাধান্য দেয়, যখন মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি হয়ে যায় বেশি অর্থ, বেশি জমি ও বেশি সম্পত্তির মালিক হওয়া, যখন তারা কোরআনের পরিবর্তে গান-বাজনাকে এবং মসজিদের পরিবর্তে বিলাসী বিনোদনকেন্দ্রকে প্রাধান্য দেয়, যখন তারা মহাভীতির দিন—কিয়ামতের কথা ভুলে যায়, তখন তারা সমাজ সংস্কারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেরণাটিই হারিয়ে ফেলে। গাফিলত ঈমানকে খেয়ে ফেলে। এর ফলে মানুষ এমন প্রাণীর মতো হয়ে যায়, যারা শুধু খায় ও পান করে; কিন্তু নিজেদের কাজের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করে না। আল্লাহ তাআলা জাতিগুলোকে তখনই ধ্বংস করেছেন, যখন তারা দুনিয়ার চাকচিক্যে মগ্ন হয়ে পড়েছিল এবং তা নিয়ে গর্ব করতে শুরু করেছিল। কারুনের কথা স্মরণ করুন। সে বলেছিল, ‘আমি তো আমার নিজস্ব জ্ঞান ও যোগ্যতার কারণেই এটি লাভ করেছি।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৮)
মানুষ মনে করতে থাকে, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে এবং কোনো বিপদ আসবে না। অথচ আল্লাহর শাস্তি এমন জায়গা থেকে এসে উপস্থিত হতে পারে, যেখান থেকে মানুষ তা কল্পনাও করেনি। সৌজেন্য কালের কণ্ঠ।