আলী আহমদ/ রেজুওয়ান কোরেশী::
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভার লুদরপুরে জমি সংক্রান্ত পুরোনো বিরোধ ও বিয়ের দাওয়াতকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাইয়ের নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলায় নিহত নাজিম উদ্দিনের (৪৫) দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
গতকাল রোববার (১৭ অক্টোবর) বাদ আসর লুদুরপুর টার্মিনাল জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়।
এদিকে, শান্তপ্রিয় এলাকায় শিক্ষানুরাগী এই যুবকের এমন নারকীয় হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসী। শোকের পাশাপাশি পুরো জগন্নাথপুরজুড়ে এখন প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে আজ সোমবার বিকেলে স্থানীয় ভবেরবাজারে এলাকাবাসীর উদ্যোগে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হয়েছে।
নিহতের বাড়িতে পিনপতন নীরবতা, স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ
গতকাল বিকেলে লুদুরপুর গ্রামে নিহত নাজিম উদ্দিনের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পুরো বাড়ি ও আশপাশে এক পিনপতন নীরবতা। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল নারীদের কান্নার রোল। নিহতের স্ত্রী, বোন ও স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতের ছোট বোন সাজিয়া বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের বড় ভাই নাজিমই বাবার মতো ভালোবাসা দিয়ে আমাদের আগলে রেখেছিল। সেই ভাইটাকে নরপিশাচরা আমাদের চোখের সামনে কুপিয়ে মারল! আমরা এই খুনিদের ফাঁসি চাই, জঘন্যতম বিচার চাই।
নেপথ্যে কী? শুধুই বিয়ের দাওয়াত নাকি বসতভিটার লোভ?
ঘটনার অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, লুদুরপুর গ্রামের মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে নিহত নাজিম উদ্দিনের সাথে তাঁর চাচাতো ভাই মাসুম মিয়ার (মৃত মাসুক মিয়ার ছেলে) পরিবারের বসতভিটা বিক্রি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছিল। ঘাতক মাসুম গংদের পরিবার বড় হওয়ায় তারা অনেকদিন ধরেই নাজিমের মূল্যবান বসতবাড়িটি তাদের কাছে বিক্রি করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু নাজিম উদ্দিন তাতে রাজি না হওয়ায় তাদের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নাজিম উদ্দিনের ছোট বোনের বিয়ে সম্পন্ন হয়। সেই বিয়ের দাওয়াত দেওয়াকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাই মাসুম মিয়ার সাথে নাজিমের মনোমালিন্য হয়। শনিবার সকালে ওলিমার (বৌভাত) দাওয়াত নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মাসুমের নেতৃত্বে ৭-৮ জন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাজিমের বসতবাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়।
যেভাবে হত্যা করা হলো ‘নাজিম মাস্টার’কে
শনিবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে নাজিম উদ্দিন যখন তাঁর ঘরের বারান্দায় অবস্থান করছিলেন, তখন ঘাতক মাসুমের দল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা করে। তারা প্রথমেই নাজিম উদ্দিনের বুকে মারাত্মক দেশীয় অস্ত্র ‘ছুলফি’ দিয়ে সজোরে আঘাত করে। ছুলফির আঘাতে নাজিম মাটিতে লুটিয়ে পড়লে খুনিরা ক্ষান্ত হয়নি।
নাজিমের মামাতো ভাই মনসুর মিয়া প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসীরা ছুলফি দিয়ে আঘাত করার পর মাটিতে পড়া নাজিম ভাইয়ের বুকের ওপর পা দিয়ে সজোরে মাড়াতে থাকে। তারা পৈশাচিক উল্লাসে বলছিল, এখনও মরছে না! মর, মর, তুই মর’ এভাবে উপর্যুপরি নির্যাতন চালিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতকেরা পালিয়ে যায়।
পরে পরিবারের লোকজনের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে নাজিমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকায় সজ্জন মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন নাজিম
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, এটি সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ওরা জায়গার লোভে নাজিমকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছে। আর বিয়ের দাওয়াতকে উসিলা করে দিনদুপুরে খুন করল। নাজিম অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি বিএ পাস করার পর এলাকায় পোস্টমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে মুদি ব্যবসা ও টিউশনি করতেন। এলাকায় সবাই তাঁকে ‘নাজিম মাস্টার’ নামে সম্মান করত। দুই ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন।
নিহতের ছোট ভাই বোরহান উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ভাইয়ের খুনিদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। খুনিরা অত্যন্ত সন্ত্রাসী প্রকৃতির হওয়ায় আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
বাড়ি তালাবদ্ধ করে পালিয়েছে ঘাতক পক্ষ
হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান অভিযুক্ত মাসুম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িটি তালাবদ্ধ। ঘটনার পর পরই ঘাতক চক্রের নারী-পুরুষ সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন বলেন, খবর পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং লাশের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই প্রতিপক্ষের লোকজন ঘরবাড়ি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে গেছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।