বিশেষ প্রতিনিধি::
জগন্নাথপুরে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সার্বিক ফলাফল স্থানীয় সচেতন মহল, অভিভাবক এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, কলেজ পর্যায়ে অর্ধেকেরও বেশি (৫৩ শতাংশ) এবং মাদরাসা পর্যায়ে প্রায় ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। জিপিএ—৫ এর সংখ্যাও মাত্র ৩টিতে সীমাবদ্ধ। একটি বৃহৎ জনপদের এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করা কেবল তাদের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না বরং উপজেলার সামগ্রিক শিক্ষার গুণগত মানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার এইচএসসিতে পাসের হার ৪৭.০৫ শতাংশ এবং আলিমে ৫০.৯৯ শতাংশ। ফলে তরুণ—তরুণীর মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার প্রথম ধাপে পা রাখতেই ব্যর্থ হয়েছে। জগন্নাথপুরের নয়াবন্দর স্কুল ও কলেজে পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ২৩.৮৮ শতাংশে এবং ঐতিহ্যবাহী ইকড়ছই মাদরাসায় তা মাত্র ২৪.২৪ শতাংশ। গত বছর এই প্রতিষ্ঠানর পাশের হার ছিল ৯১.৪৫ শতাংশ। এক বছরেই একটি নামকরা বিদ্যাপীঠের পাসের হার ৯১ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে নেমে আসা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে সচেতন মহল মনে করছেন, করোনাকালীন সময়ের পর থেকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় এক ধরনের গাফিলতি তৈরি হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা মূল্যায়নের ঘাটতি এবং বাড়িতে অভিভাবকদের উদাসীনতা এর অন্যতম বড় কারণ। বর্তমানে কিশোর ও তরুণ সমাজের পড়াশোনায় মনোযোগ হারানোর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গেমিং আসক্তি। এছাড়াও গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষকের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতার সাথে প্রতিটি বিষয় বুঝিয়ে দেওয়ার চেয়ে গৎ বাঁধা সিলেবাস শেষ করার মানসিকতা শিক্ষার্থীদের ভিত দুর্বল করে দিচ্ছে এবং বিগত সরকারের আমলে ‘অটোপাস’ কে দায়ী করেছেন তারা। এছাড়া বিদেশ প্রবণতাকেও অনেকেই ফল বিপর্যয়ের আরেকটি কারণ হিসেবে মনে করছেন।
অভিভাবক চঞ্চল দাস বলেন, মহামারি করোনারকালীণ সময় থেকে সন্তানদের পড়াশোনায় প্রবল অনীহা দেখা দেয়। এরমধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি আর বিদেশ প্রবণতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জেঁকে বসেছে। অভিভাবক পাশাপাশি শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিকতা কম। এখান থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে শিক্ষক ও অভিভাবকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জগন্নাথপুরের সামাজিক সংগঠন ‘স্টুডেন্টস কেয়ার’ এর সাধারণ সম্পাদক আলী হোসেন বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার জন্য তৈরি না করে তাকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের ক্লাসরুমে পাঠদানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মনস্তত্ত্ব পরিহার করে ছাত্র—ছাত্রীদের প্রতি পিতামাতার মতো ভালোবাসা ও নিবিড় যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বিগত সময়ে ‘অটোপাস’ ব্যবস্থাকে দায়ী করে বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনীহা তৈরী করেছে ওই ‘অটোপাস’।
জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, আমাদের সন্তান নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে কি না, বাড়িতে কতক্ষণ পড়াশোনা করছে, তা মা—বাবাকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। বিশেষ করে পড়ার টেবিলে স্মার্টফোনের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ইন্টারনেটের অপব্যবহার ও অপপ্রচার থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে হবে।
জগন্নাথপুরের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাধী আবু হোরায়রা ছাদ মাষ্টার বলেন, এইচএসসি ও আলিমে পাসের হার অর্ধেকের নিচে নেমে আসা আমাদের পুরো অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি রুখতে অভিভাবকের পাশাপাশি শিক্ষকদের কঠোর নজরদারি করতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবক একযোগে কাজ না করলে এই বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) এনামুল কবীর বলেন, এবারের ফলাফল আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, এটি সত্য। তবে এর পেছনে কিছু বাস্তব সংকটও রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসতে চায় না। আমরা শিক্ষকেরা ক্লাসে সর্বোচ্চ যত্নে পাঠদান করার চেষ্টা করছি। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকেরা যদি সন্তানের পড়াশোনা ও মোবাইল আসক্তির বিষয়ে কড়া নজরদারি না করেন, তবে ভালো ফলাফল অর্জন কঠিন। আমরা এই ফলাফলের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে আগামীতে আরো ভালো ফলাফলকরার চেষ্টা করবো।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার অরূপ কুমার রায় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রত্যাশিত ফলাফল হয় নি এবারের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায়। কলেজ পর্যায়ে গতবছরের চেয়ে এবার কিছুটা ভালো হয়েছে। আশা করছি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে আগামীতে গৌরবময় ফলাফলে ফিরে আসবে।