পবিত্র কোরআনের সামগ্রিক নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুটি বিষয় রয়েছে, আল্লাহর হক (হুকুকুল্লাহ) ও বান্দার হক (হুকুকুল ইবাদ)। এর মধ্যে ‘আল্লাহর হক’ হলো সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য ও তাঁর সব ধরনের আদেশ-নিষেধ মান্য করা। আর ‘বান্দার হক’ হলো প্রাণপ্রকৃতির প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক কাজ করা।
কোরআনের সমাজচিন্তায় মানবসেবা বা পরার্থপরতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। অর্থাৎ জাকাত ছাড়া অন্যান্য সেবামূলক কাজগুলো ‘করলে সওয়াব হবে, আর না করলে ক্ষতি নেই’—এই ধরনের নয়। বরং বিভিন্ন আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে সেবামূলক কাজ ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, অন্তরে লালিত বিশ্বাসের সামাজিক বহিঃপ্রকাশ।
বিশেষত মক্কায় নাজিল হওয়া সুরাগুলোতে সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক কাজকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ কারণে মুসলমানদের একটি দল যখন মক্কা থেকে বর্তমান ইথিওপিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তখন সেখানকার শাসক নাজ্জাশির কাছে ইসলামের পরিচয় দিতে গিয়ে সাহাবি জাফর বিন আবু তালিব বলেন:
‘জাহাঁপনা, আমরা জাহিল ছিলাম ও মূর্তিপূজা করতাম। মৃত জানোয়ার খেতাম। বেহায়াপনায় লিপ্ত ছিলাম। আত্মীয়তা ছিন্ন করতাম। পাড়াপড়শির সাথে দুর্ব্যবহার করতাম। আমাদের শক্তিমানেরা দুর্বলদের শুষে খেত। আমরা এমন নাজুক পরিস্থিতিতে ছিলাম, তখন আল্লাহ–তাআলা আমাদের কাছে একজন পয়গম্বর পাঠান, যার বংশমর্যাদা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও নিষ্কলুষতা সম্পর্কে খুব আগে থেকেই ভালো করে জানতাম।
‘তিনি আমাদের একত্ববাদের দিকে দাওয়াত দেন, যেন আমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করি এবং আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে পাথরের মূর্তির উপাসনা করত, তা যেন ছেড়ে দিই। তিনি আমাদের সব সময় সত্য বলা, আমানত রক্ষা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, পাড়াপড়শির সঙ্গে ভালো আচরণ করা, হারাম কাজ ও খুনখারাবি থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেন।
তিনি আমাদের বেহায়াপনা, মিথ্যা বলা, এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করা, সতী নারীকে অপবাদ দেওয়ার মতো (অপরাধমূলক) কাজ করতে নিষেধ করেন …’। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭৪০)
বক্তব্যের এই অংশ থেকে তৎকালীন মুসলমানদের সেবামূলক সাতটি তৎপরতার নজির পাওয়া যায়—
এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসলাম প্রচারের প্রথম যুগ থেকেই আল্লাহর হক ও বান্দার হক রক্ষার বিষয়টি অবিচ্ছেদ্যভাবে মুসলমানদের আচরণে প্রকাশ পেয়েছে। কারণ, কোরআনে দুটি বিষয়কে আলাদা করা হয়নি, বরং একই আয়াতে একত্রে আলোচনায় এনে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আমরা এখানে কোরআনে বর্ণিত এমনই কিছু আয়াত উপস্থাপন করব, যেখান থেকে এই বিষয় প্রমাণিত হয়।
আয়াতে সব ধরনের মানুষের প্রতিই ইহসান করতে বলা হয়েছে। আর ইহসান শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর আওতায় সেবামূলক ও অধিকার রক্ষার প্রতিটি বিষয়ই রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর এবাদত করো ও কোনো কিছুকে তাঁর শরিক করো না এবং পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূরের প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসদাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো, নিশ্চয় আল্লাহ–তাআলা দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬)
অনেক মুফাসসিরের মতে, আয়াতে উল্লিখিত ‘দূরের প্রতিবেশী’ দ্বারা অমুসলিম প্রতিবেশী উদ্দেশ্য। মোটাদাগে এই আয়াতে সব ধরনের মানুষের প্রতিই ইহসান করতে বলা হয়েছে। আর ইহসান শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর আওতায় সেবামূলক ও অধিকার রক্ষার প্রতিটি বিষয়ই রয়েছে।
কোরআনে ১৩টি সুরায় মোট ২২টি আয়াতে এতিমদের কথা বলা হয়েছে। এসব আয়াতে কেবল তাদের আর্থিক সাহায্য বা খাবার খাওয়াতে বলা হয়নি, বরং তাদের একটি সুন্দর জীবনের বন্দোবস্ত করতে নির্দেশ করা হয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর লোকেরা আপনাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, বলুন, তাদের জন্য সুব্যবস্থা করা উত্তম। তোমরা যদি তাদের সাথে একত্রে থাক, তবে তারা তো তোমাদেরই ভাই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২০)
এর পাশাপাশি তাদের ওপর ইনসাফ করতে বলা হয়েছে। যেন সেবা করতে গিয়ে আবার তাদের ক্ষতি করা না হয়।
পবিত্র কোরআনে অভাবী, দুস্থ, নিরুপায় ও মজলুম মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা, তাদের কষ্ট লাঘব করা এবং তাদের স্বস্তি ও আরাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে নিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষে সুপারিশ করা ও তাদের সহযোগিতা করাকে অনেক বড় সওয়াবের কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের সুপারিশ করবে, তা থেকে তার একটি (সওয়াবের) অংশ থাকবে, আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজের সুপারিশ করবে, তার জন্যও (পাপের) একটি অংশ থাকবে। আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর নজর রাখেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৮৫)
এই আয়াতের তাফসিরে মাওলানা শাব্বির আহমদ ওসমানি (রহ.) লিখেন, ‘কেউ যদি কোনো অভাবীর জন্য সুপারিশ করে বিত্তশালী ব্যক্তির কাছে থেকে কিছু আদায় করে দেয়, তবে সে-ও ওই খয়রাত বা দানের সওয়াবের অংশীদার হবে।’ (তাফসিরে ওসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৬, আল কোরআন একাডেমি লণ্ডন)
আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীকে খাবার দান করে এবং বলে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে খাবার দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। (সুরা দাহর, আয়াত ৮-৯)
যারা খেতে পায় না, তাদের সেবায় এগিয়ে যাওয়া এবং তাদের খাদ্য-পানীয়ের ব্যবস্থা করাকে হাদিসে স্বয়ং ‘আল্লাহকে খাওয়ানো’ বলা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ–তাআলা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার সেবা-শুশ্রূষা করোনি।’
বান্দা বলবে, ‘হে আমার রব, আমি আপনাকে কীভাবে সেবা-শুশ্রূষা করব, অথচ আপনি সারা জাহানের প্রতিপালক!’
আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তুমি তার সেবা-শুশ্রূষা করোনি? তুমি কি জানতে না যে তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, তবে আমাকে তার কাছেই পেতে?’
এরপর বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে খাবার খাওয়াওনি।’
বান্দা বলবে, ‘হে আমার পরওয়ারদিগার, আমি আপনাকে কীভাবে খাওয়াতাম, অথচ আপনি তো রাব্বুল আলামিন!’
আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খাওয়াওনি? তুমি কি জানতে না যে তুমি যদি তাকে খাওয়াতে, তবে তা আজ আমার কাছে পেতে!’
এরপর তিনি বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাওনি।’
বান্দা বলবে, ‘হে আমার রব, আমি আপনাকে কীভাবে পানি পান করাতাম, অথচ আপনি তো সারা জাহানের প্রতিপালক!’
আল্লাহ বলবেন, ‘আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে পানি দাওনি। জেনে রাখো, তুমি যদি তাকে পানি পান করাতে, তবে তা আজ আমার কাছে পেয়ে যেতে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৯)
সৌজন্যে প্রথম আলো