২৪ ঘণ্টার দৈনন্দিন জীবনে মানবজাতির চূড়ান্ত অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিদিন কোন নির্দিষ্ট সময়ে সবচেয়ে বেশি আমল করতেন এবং সেই আমলগুলোর ধরন কী ছিল—তা নিয়ে খ্যাতিমান ইসলামী স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বিস্তারিত দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা পেশ করেছেন। আলোচনাটি তার ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছে।
শায়খ আহমাদুল্লাহর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আল্লাহর রাসুল (সা.) পুরো দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘুমানোর পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ রাতে শোয়ার আগের সময়টাতে সবচেয়ে বেশি দোয়া, জিকির এবং কোরআন তেলাওয়াতে আত্মনিয়োগ করতেন। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আমাদের এই মহামূল্যবান সময়টি গ্রাস করে নিয়েছে মোবাইল ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমলের সময় ও শয়তানের কৌশল
শায়খ আহমাদুল্লাহ তার বক্তব্যে ইসলাম ও সুন্নাহর এক গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরে বলেন, কোরআন ও হাদিস যে সময় বা আমলকে যত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, শয়তান ঠিক সেই সময় ও আমলটির ওপর তত বেশি আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মানুষের জন্য ঘুমানোর আগের সময়টা অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ ইসলামে ঘুমকে মৃত্যুর সহোদর হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে আধুনিক মানুষ রাতের এই সময়টিতে দুনিয়ার শেষ আপডেট বা সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে।
শোয়ার আগে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক দিক থেকেও চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সময়টিতে সবচেয়ে বেশি প্রভূর স্মরণে সময় কাটাতেন, আজকের মুসলিম সমাজ ঠিক সেই সময়টিতেই ডিজিটাল আসক্তিতে ডুবে থাকছে।
রাতে শোয়ার আগের মাসনুন আমলের সময়সীমা ও বিন্যাস
হাদিসের বিশুদ্ধ বর্ণনার আলোকে জানা যায়, নবী করীম (সা.) রাতের শোয়ার আগে যেসব দোয়া, জিকির ও কোরআন তেলাওয়াত করতেন, সেগুলো সঠিকভাবে আদায় করতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা (কমপক্ষে দেড় ঘণ্টা) সময় প্রয়োজন। যেখানে সকাল ও সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া-জিকির সম্পন্ন করতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় যথেষ্ট, সেখানে রাতের আমলের ব্যাপ্তি ছিল সবচেয়ে বিস্তৃত।
রাতের শোয়ার আমলগুলোকে শায়খ আহমাদুল্লাহ মূলত চার ভাগে ভাগ করেছেন:
তেলাওয়াতযোগ্য নির্দিষ্ট সুরা ও দোয়া
হাদিসের নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, রাতের শোয়ার আগে নবীজি (সা.) নির্দিষ্ট কিছু সুনির্দিষ্ট সুরা ও আয়াত নিয়মিত তেলাওয়াত করতেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
কোরআনের এসব অংশের পাশাপাশি মহানবী (সা.) রাতে শোয়ার আগে প্রায় ১০ থেকে ১৩টি বিভিন্ন ফরম্যাটের দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ দোয়া পাঠ করতেন।
হজরত ফাতেমা (রা.)-এর হাদিস ও ‘তাসবিহে ফাতেমি’
রাতের শোয়ার অন্যতম প্রধান ও বহুল পরিচিত আমল হলো ‘তাসবিহে ফাতেমি’। হজরত ফাতেমা (রা.) ও হজরত আলী (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে শোয়ার আগে ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, হজরত ফাতেমা (রা.) হাতে আটা পেষার যাঁতা ঘোরানোর কারণে হাতে দাগ পড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত শারীরিক কষ্টের কারণে নবীজি (সা.)-এর নিকট একজন গৃহপরিচারক চেয়ে পাঠান। কিন্তু মহানবী (সা.) রাতে তাঁদের বাসায় গিয়ে পরম স্নেহ ও মমতায় মেয়ে ও জামাতার মাঝখানে বসে এই আমলটি শিখিয়ে দেন। তিনি জানান, গৃহপরিচারক পাওয়ার চেয়ে এই তাসবিহ পাঠ করা তাঁদের শারীরিক ক্লান্তি লাঘব এবং আখেরাতের কল্যাণের জন্য অনেক বেশি উপকারী হবে।
ইসলামী এই স্কলার আক্ষেপ করে বলেন, আমরা সামান্য চাওযাতেই সন্তানদের হাতে দামি মোবাইল ফোন তুলে দিয়ে তাদের বিপদ ডেকে আনি; অথচ নবীজি (সা.) নিজের সন্তানকে পার্থিব সুবিধার পরিবর্তে জিকির ও সুন্নাহর চিরন্তন সম্পদ দান করেছেন।
আমল না করার মূল কারণ ও শয়তানের প্ররোচনা
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাতের শোয়ার আগের এই আমলগুলো অত্যন্ত সহজ এবং মাত্র কয়েক মিনিটের কাজ হওয়া সত্ত্বেও সিংহভাগ মানুষ তা আদায় করতে পারে না। সাহাবায়ে কেরাম এর কারণ জানতে চাইলে নবীজি (সা.) স্পষ্ট করেন যে, মানুষ যখন ঘুমোতে যায়, তখন শয়তান এসে তাকে দ্রুত ঘুম পাড়িয়ে দেয় অথবা অন্য চিন্তায় মশগুল করে ফেলে। ফলে তাসবিহ ও দোয়া শেষ করার আগেই মানুষ অলসতায় ঘুমিয়ে পড়ে।
ডিজিটাল আসক্তি কাটিয়ে সুন্নাহয় ফেরার ব্যবহারিক উপায়
শায়খ আহমাদুল্লাহ বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, প্র্যাকটিসিং মুসলিমদের মধ্যেও রাতের শোয়ার আমল প্রায় বিলুপ্তির পথে। ১৫ মিনিট ধরে রাতে আমল করার অভ্যাসও এখন দুর্লভ। এই ডিজিটাল আসক্তি থেকে বেঁচে সুন্নাহ আমল পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ প্রদান করেছেন:
সাধারণ মানুষ যেন সহজেই রাতে শোয়ার আমলগুলো দেখে অনুশীলন করতে পারে, সে লক্ষ্যে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা বা পুস্তিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন আহমাদুল্লাহ। সৌজন্যে কালবেলা