জগন্নাথপুর২৪ ডেস্ক::
দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মাদকাসক্তদের হাতে পরিবারের সদস্য খুন হচ্ছেন। মাদক কারবারে দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুনোখুনি, হামলার ঘটনাও ঘটছে। গত ১ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ১৩ জন খুন হয়েছেন। হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে পাঁচজনকে। এ ছাড়া মাদকাসক্ত এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৩ খুনের মধ্যে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে তিনজন বাবা ও দুই মা নিহত হন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়; পরিবারকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। একজন মাদকসেবীর কারণে অশান্তিতে থাকে পুরো পরিবার। নেশার টাকা জোগানো, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়ায় অনেক আসক্ত। ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধের ঘটনায় তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে মাদক সেবনের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), কুশ, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক রাজধানী ও বড় শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এতে সামাজিক ও পারিবারিক কলহও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তাদের অধিকাংশই তরুণ। সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, গত জুনে খুন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে ১৮ হাজার ৮২০টি মামলা হয়। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার সংখ্যা ছয় হাজার ৫৮০টি, যা মোট মামলার প্রায় ৩৫ শতাংশ।
কারা অধিদপ্তর সূত্র বলছে, ২৯ জুলাই দেশের সব কারাগার মিলিয়ে বন্দি ছিল ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। এর মধ্যে মাদক-বিষয়ক মামলায় বন্দি ১৭ হাজার ৮১৯ জন, যা মোট বন্দির ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ২২৬ জন, নারী ৫৯৩ জন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে চারটি এবং বেসরকারি ৩৮৫টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে এসব মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ২১ হাজার আটজন মাদকাসক্তকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, মাদকাসক্ত সন্তান কিংবা স্বামী পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও মানসিক অশান্তি সৃষ্টি করছে। ফলে অনেক পরিবারে সম্পর্কগত সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যে সংকট পরিবারে ভাঙন তৈরি করছে। একই সঙ্গে মাদকের অর্থ সংগ্রহে মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাদক প্রবেশ ও সহজলভ্যতা রোধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মাদকাসক্তির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে অনেকে গ্রেপ্তার হচ্ছেন; আবার তারা জামিনে বেরিয়ে একই কাজ করছেন। তিনি বলেন, মাদক আসে দেশের বাইরে থেকে। সে ক্ষেত্রে সীমান্তে যারা আছে, তাদেরও দায়-দায়িত্ব অনেক। চালানগুলো কীভাবে আসে, সেগুলো দেখা দরকার। আবার দেশের ভেতরেও সেভাবে রোধ করা যাচ্ছে না।
মাদক ঘিরে খুন
গত ৩০ জুলাই ফরিদপুরের বায়তুল আমান এলাকায় মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মা সাহেলা বেগমকে খুন করে তাঁর ছেলে আব্দুর রহিম শেখ। প্রায় ১০ বছর আগে রহিম সৎমাকেও খুন করেছিল। ২৭ জুলাই সাভারের রাজফুলবাড়িয়ার ছাকিপাড়ায় মহিন মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে তাঁর কিশোর ছেলে। ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মাদকাসক্ত ছেলে রিমন দাশগুপ্তের ছুরিকাঘাতে মা-বাবা নিহত হন। ৩ জুলাই পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে মাদকাসক্ত ছেলে তাপস দেবনাথ শিলপাটা দিয়ে আঘাত করে ঘুমন্ত বাবা উত্তম দেবনাথকে খুন করে। মাদক কেনার টাকা না পেয়ে গত ১২ জুলাই রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে গার্মেন্টকর্মী স্ত্রী নাছিমা আক্তারকে কুপিয়ে হত্যা করে সাহেদুল ইসলাম।
এ ছাড়া মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে ২২ জুলাই যশোর শহরের বারান্দীপাড়া ফুলতলা মোড়ে শরিফুলকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৬ জুলাই নোয়াখালীর কবিরহাটে মাদক নিয়ে পূর্বশত্রুতার জেরে মোহাম্মদ ফারুক নামে এক ব্যক্তি খুন হন।
এদিকে মাদক ঘিরে গত ২১ জুলাই রাজধানীর হাজারীবাগ, ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ, ১৭ জুলাই কুষ্টিয়ার খোকসার দেবীনগর, ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকা এবং ১ জুলাই চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের মুরাদপুরে একজন করে খুন হন।
চাঞ্চল্যকর হত্যা
মাদকাসক্তির কারণে দেশের চাঞ্চল্যকর হত্যার অন্যতম ২০১৩ সালের আগস্টে রাজধানীর চামেলীবাগের পুলিশ দম্পতি খুন। মাদকাসক্ত মেয়ে ঐশী রহমানের হাতে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমান। মা-বাবা হত্যার দায়ে ঐশী এখন কারাবন্দি। বিচারিক আদালত প্রথমে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে উচ্চ আদালত সেই সাজা কমিয়ে ঐশীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এক মায়ের আর্তনাদ
চার সন্তানের মধ্যে বড় ও মেজো ছেলে প্রায় সাত বছর ধরে ইয়াবায় আসক্ত। কর্মহীন এ দুই ভাই একসঙ্গে মাদক সেবন করে। ইয়াবা কেনার টাকা না পেলেই ব্যবসায়ী বাবা ও সরকারি চাকরিজীবী মায়ের ওপর চালাত নির্যাতন। মাদকের টাকার জন্য শুধু ঘরের আসবাবই নয়; দরজাও খুলে বিক্রি করে। নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে তারা। দুই ছেলের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দুই বছর আগে তাদের বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
গত ৮ জুলাই তারা মায়ের কাছে ১৩ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঘরের আসবাব ভাঙচুর করে মাকে হত্যার হুমকি দেয়। নিরুপায় হয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দুই ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন অসহায় মা। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। ঘটনাটি ঘটে গত ৯ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে।
গত ২৯ জুলাই ওই মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। তিনি বলেন, দুই ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অনেক চেষ্টা করেছি। আমার সাজানো-গোছানো সংসার তারা তছনছ করে দিয়েছে।
এদিকে গত ৩০ জুলাই জামালপুরের বকশীগঞ্জে মাদকাসক্ত ছেলে নাহিদ মিয়াকে পুলিশে দেন এক বাবা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই যুবককে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
মাদকের কারণে ভাঙছে সংসার
স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিয়ে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন রিকশাচালক মো. শাকিল। হেরোইনে আসক্ত হওয়ার পর রিকশা চালানো এক রকম ছেড়েই দেন। তিন মাসের বাসা ভাড়া বকেয়া থাকায় হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান শাকিল। তখন দেড় বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে রায়েরবাজারের রিকশাচালক বাবার বাসায় ওঠেন স্ত্রী ফারজানা আক্তার সাথী। তিন মাসের মধ্যে শাকিল স্ত্রীর খোঁজ নেননি। গত ২৫ জুলাই ধানমন্ডির একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে শাকিলের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে জানায় পুলিশ।
অটোরিকশা ছিনিয়ে নিতে বন্ধুকে খুন
মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদী থেকে গত ২৫ মার্চ অটোচালক রফিক মিয়ার মাথাহীন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আগের দিন অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। হত্যা মামলার তদন্তে নেমে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আসামিরা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন, তাদের কাছে মাদক কেনার টাকা ছিল না। তাই বন্ধু রফিকের অটোরকিশা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন তারা। পরে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে রফিককে কালীগঙ্গা নদীর তীরে ডেকে নিয়ে যান। রফিক বুঝতেই পারেননি, বন্ধুত্বের নামে তারা তাঁর জীবন কেড়ে নেবেন। গলা কেটে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে রিকশা নিয়ে পালিয়ে যান তারা। সূত্র-সমকাল