বিশেষ প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা সদরের নলজুর নদীর ওপর জনগুরুত্বপূর্ণ ডাকবাংলো সেতুর নির্মাণ কাজ দীর্ঘ ৭ মাস বন্ধ থাকার পর পুনরায় শুরু হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে নদীতে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি চলে আসায় এই সেতুর কাজ সাময়িকভাবে থমকে গিয়েছিল। সম্প্রতি নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় গত কয়েকদিন ধরে পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয়দের মাঝে। তবে আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই সেতুর কাজ সম্পূর্ণ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন উপজেলাবাসী।
আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন নলজুর নদীর ওপর ডাকবাংলো সেতুর পশ্চিম অংশে পাইলিংয়ের কাজ করছেন শ্রমিকরা। মূল পাইলিংয়ের কাজ শুরুর জন্য বর্তমানে পাইলিং মেশিন প্রস্তুত করা হচ্ছে। সাইটে কর্মরত শ্রমিকরা জানান, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে মূল পাইলিংয়ের কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে।
কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাদিকুর রহমান সাদিক জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ‘ফ্লাড-২০২২’ প্রকল্পের আওতায় সেতুটির টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পুরাতন জরাজীর্ণ সেতু ভেঙে নতুন সেতুর কাজ শুরু হয়। কিন্তু এপ্রিলে পাহাড়ি ঢলের পানির কারণে কাজ বন্ধ করতে হয়েছিল। দীর্ঘ ৬ মাস পর গত ১৫ অক্টোবর থেকে পুনরায় কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী ২০২৭ সালের মার্চ মাসের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ সমাপ্ত হবে।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা অরূপ সরকারের সঙ্গে। তিনি জানান, সেতুটি আমাদের যাতায়াতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর কাজ শেষ হলে শহরের যানজট যেমন কমবে, তেমনি মানুষের দুর্ভোগও দূর হবে। নদীতে পুনরায় পানি আসার আগেই যেন দ্রুত কাজটি সম্পন্ন করা হয়।
সেতুর পাশের তাসলিম চুলা ঘরের স্বত্বাধিকারী সুহেল আহমদ বলেন, সেতুটি ভেঙে নতুন করে করায় সাময়িক ভোগান্তি হলেও এটি শেষ হলে পুরো উপজেলাবাসী উপকৃত হবেন। আমাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেন সঠিক নিয়ম মেনে সেতুর কাজ শেষ করা হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও এলাকাবাসী সূত্র জানায়, জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে নলজুর নদীর ওপর ১৯৮৬ সালে খাদ্য গুদামের সামনে ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের বাস্তবায়নে নলজুর সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। তৎকালীন সময়ে সেতুর স্থান নির্ধারণ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা হারুনুর রশীদ হিরন মিয়া ও জাতীয় পার্টি নেতা আছাব আলীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।
জগন্নাথপুর, ইকড়ছই, ছিলিমপুর, বলবল, ভবানীপুর, যাত্রাপাশা ও শেরপুরগ্রামবাসী নলজুর নদীর ডাকবাংলো এলাকায় সেতু নির্মাণের দাবি জানান। কিন্তু হবিবপুর গ্রামের লোকজন গুদামের সামনে বাস্তবায়ন করতে চান। জাতীয় পার্টি সরকারের শাসনামলে প্রভাব খাটিয়ে আছাব আলী সেতুটি গুদামের সামনে বাস্তবায়ন করেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নদীর পূর্বপাড়ের জগন্নাথপুর ও পশ্চিমপাড়ের ইকড়ছইসহ পশ্চিম এলাকার মানুষ ও জগন্নাথপুর বাজারের ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে ডাক বাংলা এলাকায় সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তৎসময় জগন্নাথপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা প্রতি রবি ও বুধবার দুই টাকা করে চাঁদা তুলে ফান্ড সংগ্রহ করেন। চাঁদা সংগ্রহের টাকায় সেতুর নীচের সব পিলারের কাজ শেষ হলেও ১৯৯৬ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের নির্দেশে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে সেতুর অসমাপ্ত কাজ শেষ করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে নলজুর নদী খননকালে অসাবধানতাবশত খননযন্ত্র (এস্কেভেটর) দিয়ে পিলারের কাছ থেকে মাটি তোলায় ডাকবাংলো সেতুর দুটি অংশ দেবে যায়। এক বছর বন্ধ থাকার পর স্টিলের পাটাতন বসিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সেতুটি সচল রাখা হলেও তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপরই নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের জুন মাসে ‘মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮ ফুট প্রস্থের এই সেতুর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন জানান, নাগরিক ভোগান্তি কমাতে আমরা মূল সেতুর পাশেই একটি বিকল্প বাঁশের সাঁকো স্থাপন করেছি। এ ছাড়া শহরের প্রধান আর্চ সেতু দিয়ে বর্তমানে সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। নদীর পানি কমায় এখন কাজ দ্রুত চলছে। এই আধুনিক সেতুটি নির্মিত হলে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ স্থায়ীভাবে দূর হয়ে যাবে।